ডেঙ্গু প্রতিরোধে এখনও কার্যকর প্রস্তুতি নিচ্ছে না সরকার

বাংলাদেশে প্রতিবছর ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তিনটি জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে প্রাক-বর্ষা জরিপটি বর্ষা আসার আগেই শেষ হওয়ার কথা থাকে, কিন্তু এবছর তা এখনও শুরু হয়নি। একইভাবে ২০২৪ সালের বর্ষা-পরবর্তী জরিপের প্রতিবেদনও এখনো প্রস্তুত হয়নি। সাধারণত বর্ষা শুরুর সাথে সাথে ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে এবং বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন এবছরও এপ্রিল থেকে ডেঙ্গু বিস্তার বাড়বে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তেমন কোনো প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে না।

২০২৪ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন, আর মৃতের সংখ্যা ৫৭৫ জন। গত বছরও এপ্রিল থেকেই ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকে এবং অক্টোবরের দিকে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ডেঙ্গু সংক্রমণের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার গত বছর পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়নি এবং এবছরও সেভাবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারের প্রস্তুতি শিথিল হওয়ায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম) এর কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের আরও তৎপরতা প্রয়োজন, কারণ মশার ঘনত্ব দিনদিন বাড়ছে। ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুর হার ছিল এক রকম, তবে ২০২২ ও ২০২৩ সালে তা দ্বিগুণ হয়েছে, এবং ২০২৪ সালেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি বছরই ডেঙ্গু আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হচ্ছে। এ কারণে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আরও তৎপরতা এবং প্রস্তুতির প্রয়োজন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হাসান সিদ্দিকী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার লার্ভা ধ্বংস করা সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি। তবে সরকারের মনোযোগ সেখানে কম। তিনি উল্লেখ করেন ডেঙ্গুর চারটি ধরন রয়েছে এবং যদি কোনো ব্যক্তি প্রথমবার একটি ধরন এবং দ্বিতীয়বার ভিন্ন ধরনে আক্রান্ত হন, তবে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ কারণে সরকারের উচিত ভাইরাসের ধরন নিয়ে গবেষণা করা এবং ডেঙ্গু আক্রান্তের মৃত্যুহার কমানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া। কিন্তু সরকার এখনও সেই দিক থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

চলতি বছর ইতিমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। জানুয়ারিতে ১ হাজার ১৬১ জন এবং ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয় তবে আসন্ন ডেঙ্গু মৌসুমে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা না থাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণও ডেঙ্গু বিস্তারের একটি প্রধান কারণ। সরকারের উচিত পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে উৎসাহিত করা।

অবশেষে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সরকার প্রস্তুতি নিয়েছে।কিন্তু জনগণের সচেতনতা বাড়ানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ডেঙ্গু ছড়ানোর প্রধান কারণ হলো পরিষ্কার পানি জমে রাখা এবং এই বিষয়ে জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে। সর্বোপরি বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয় তাহলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি চলতি বছর আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে, যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলবে।


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন