ডলারের বিশ্বজয়ের শুরু হয় ১৯৪৪ সালে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে। যুদ্ধে ইউরোপ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ব্রিটেন আর্থিক সংকটে জর্জরিত। জার্মানি ও জাপানের অর্থনীতি চূর্ণ-বিচূর্ণ। এমন অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার জন্য আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারে ব্রেটন উডস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক লেনদেনের ভিত্তি হবে মার্কিন ডলার। আর তা সোনার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, প্রতিটি ডলার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনার সমতুল্য হবে। আর বিশ্বের অন্যান্য মুদ্রাগুলো তাদের মান নির্ধারণের জন্য ডলারের ওপর নির্ভর করবে।
এই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যায়। কারণ, এখন বিশ্বের অন্যান্য দেশকে নিজেদের মুদ্রার মান ঠিক রাখতে হলে ডলারের রিজার্ভরাখতে হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লেনদেনে ডলার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। … ১৯৭১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন…ঘোষণা করলেন, ‘এখন থেকে ডলার আর স্বর্ণের সঙ্গে যুক্ত থাকবে না।’ এর মানে দাঁড়াল, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে ইচ্ছেমতো ডলার ছাপাতে পারবে, এবং এর কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকবে না। বিশ্ব অর্থনীতিতে এটি ছিল এক বিশাল ধাক্কা। এটি ইতিহাসে ‘নিক্সন শক’ নামে পরিচিত। এই ঘোষণার মাধ্যমে ডলার এক সম্পূর্ণ নতুন রূপে আবির্ভূত হলো। সে এখন শুধু একটি কাগজের মুদ্রা নয়। বরং এক প্রকার বিশ্বাসের প্রতীক। মানুষ যত দিন বিশ্বাস করবে যে ডলার মূল্যবান, তত দিন এটি চলবে।
… ১৯৭৩ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি গোপন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে বলা হয়-সৌদি আরব তেল বিক্রির ক্ষেত্রে শুধু ডলার গ্রহণ করবে। এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা ও নিরাপত্তা দেবে। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ওপেক (অর্গানাইজেশন ফর পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ) দেশগুলোও এই চুক্তির অনুসরণ করে। ফলাফল হলো, বিশ্বের সব দেশকে তাদের প্রয়োজনীয় তেল কেনার জন্য ডলার সংগ্রহ করতে হলো।… ফলে, দেশগুলো তাদের রিজার্ভে ডলার জমাতে বাধ্য হলো। এভাবেই ডলার স্বর্ণের পরিবর্তে ‘তেলের মানদণ্ডে’ পরিণত হলো। একে বলা হয় ‘পেট্রোডলার ব্যবস্থা’। এই ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করল। কারণ, এখন তারা যত খুশি ডলার ছাপাতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোকে তা ব্যবহার করতে বাধ্যও করতে পারে।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ডলারে ঋণ দিতে শুরু করল।…এভাবে ডলার শুধু একটি মুদ্রা নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠল। … সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক দেশ ও জোট ডলারের বিকল্প ব্যবস্থার দিকে এগোতে শুরু করেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তিশালী পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে ডলারের অব্যাহত আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের উত্থান গত দুই দশকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ২০০০ সালের দিকে চীনের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে ছোট ছিল। কিন্তু ২০২০-এর পর দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়। চীন শুধু উৎপাদনশীলতার দিক থেকে নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যে তাদের নিজস্ব মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়িয়ে ডলারের আধিপত্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।
… রাশিয়া এখন তার প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে রুবল ও ইউয়ানভিত্তিক লেনদেন চালু করেছে। ভারত ও চীনের সঙ্গে রাশিয়া তেলের দাম রুবল ও ইউয়ানে নিচ্ছে, যা ডলারের জন্য বড় একটি ধাক্কা। ফলে ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থা, যেখানে এখন ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করেছে। … ডলারের আধিপত্য হারানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক ধাক্কা হতে পারে। কারণ, মার্কিন সরকার এত দিন ধরে বিশাল পরিমাণ ঋণ নিয়ে চলেছে, যার বেশির ভাগই ডলার ছাপিয়ে পরিশোধ করা হয়। যদি বিশ্ব ডলারের বিকল্প ব্যবহার শুরু করে, তাহলে মার্কিন ডলারের চাহিদা কমে যাবে এবং মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বেশ কয়েকটি কৌশল অবলম্বন করছে ডলারের প্রভাব ধরে রাখতে-যেমন, নতুন বাণিজ্য চুক্তি করা; বিশ্বব্যাপী সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করা ও চীনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যযুদ্ধ চালিয়ে তাদের মুদ্রার উত্থান ঠেকানো।


