বর্তমান বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি নতুন যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বেশিরভাগ মানুষই এই মাধ্যমকে বেছে নেন তাদের মতামত প্রকাশের জন্য। একদিকে যেমন অ্যাকটিভিজম বা সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে কণ্ঠ উঠছে, অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়ছে ট্রোলিং নামক এক বিষ। এই দুইয়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে এক গভীর দ্বন্দ্ব।
ট্রোলিং বলতে বোঝায় কাউকে উসকানো, অপমান করা বা বিদ্রূপের মাধ্যমে মানসিক আঘাত দেওয়া। অনলাইনে ট্রোলিং এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বাংলাদেশে ট্রোলিংয়ের কয়েকটি ধরন প্রচলিত, যেমন: টেক্সট-ভিত্তিক, ভিডিও এবং ছবি বা মিম ব্যবহার করে ট্রোলিং। ট্রোলিংয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো—গুজব ছড়ানো, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে অপমান ও মানসিক চাপ সৃষ্টি।
অ্যাকটিভিজম হলো একটি সংগঠিত প্রচেষ্টা, যা সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য পরিচালিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণসচেতনতা বাড়ানো। বর্তমানে অ্যাকটিভিজম শুধু রাস্তার আন্দোলনে সীমাবদ্ধ নয়, এটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত বিষয়ে মানুষ সোচ্চার হচ্ছে এবং বিভিন্নভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে অনেক অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া যাচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। যেমন, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নতুন আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এছাড়া নারী অধিকার আন্দোলনের ক্ষেত্রে #MeToo হ্যাশট্যাগটি নারীর নিরাপত্তা ও সম্মানজনিত বিষয়গুলোকে সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
ট্রোলিং যেখানে সস্তা বিনোদন, সেখানে অ্যাকটিভিজম একটি দায়িত্বশীল আচরণ। ট্রোলিংয়ের ভয় ও চাপ অ্যাকটিভিজমের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। অনেকের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর মুক্ত মতপ্রকাশের জায়গা নয়; বরং এটি ভয় ও হুমকির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রোলিংয়ের শিকারদের মধ্যে অধিকাংশই ১৮-৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী, বিশেষ করে নারী ও ধর্মীয়-সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তরুণ অ্যাকটিভিস্টরাও এর শিকার হচ্ছেন।
বাংলাদেশে নারী হয়রানি ও ট্রোলিংয়ের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ফেইসবুক, টিকটক, ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রামে নারীদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, অপমানজনক মিম, এডিটেড ভিডিও ও ব্যক্তিগত ছবি নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এই ট্রোলিং ও ডিজিটাল হয়রানি শুধু মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে না, নারীদের সামাজিক অংশগ্রহণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব হয়রানিকারীর পরিচয় অজ্ঞাত থাকে, যা তাদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু অনলাইন সমস্যা নয়, একটি সাংস্কৃতিক চর্চার রূপ নিচ্ছে। দ্রুত প্রতিরোধ না করলে নারীর নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহিংসতা আরও ভয়াবহ হতে পারে।
কিছু মানুষ তথ্য যাচাই না করেই ট্রোলিং শুরু করেন, মিথ্যা রটনার মাধ্যমে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করেন। অনেকে যাচাই না করেই মিম, ভিডিও বা পোস্টে বিশ্বাস করে আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। ফলে অনেকে ভিন্নমত প্রকাশে ভয় পান।
এই দ্বন্দ্ব তখনই শেষ হবে, যখন মানুষ সহনশীল মতপ্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তুলবে। শেয়ার করার আগে তথ্য যাচাই করা জরুরি। তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল এথিকস, দায়িত্বশীলতা ও সাইবার সুরক্ষা বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। রিপোর্টিং, ফ্যাক্ট-চেকিং ও কনটেন্ট ফিল্টারিং আরও কার্যকর করতে হবে।
সরকার, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত দায়িত্ব হলো এই ভয়ের পরিবেশ দূর করা এবং এমন সমাজ গড়ে তোলা—যেখানে ভিন্নমত ও যুক্তিভিত্তিক তর্ক থাকবে, কিন্তু অপমান ও দমনের প্রবণতা থাকবে না। তবেই ট্রোলিং বন্ধ হবে এবং অ্যাকটিভিজম সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে, গণতন্ত্র শুধু ভোটাধিকারে সীমাবদ্ধ থাকবে না।


