যুদ্ধবিরতি ভেঙে গত সোমবার দিবাগত রাতে গাজায় বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। ফক্স নিউজের হ্যানিটি শোতে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বলেছেন, হামলার আগে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেছে ইসরায়েল। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন — হামাস, হুথি, ইরান এরা কেবল ইসরায়েলকে নয়, যুক্তরাষ্ট্রকেও টেরোরাইজ করতে চায়। তাদের সকলকে এর মূল্য দিতে হবে। সবাইকে ভেঙে দেওয়া হবে। এর আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেছেন, হামাসকে গাজায় আটক সকল জিম্মিকে মুক্তি দিতে হবে। নইলে তাদের ভেঙে দেওয়া হবে।
ইসরায়েলি সরকারের মুখপাত্র ডেভিড মেনসার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, আমি নিশ্চিত করতে পারি যে গাজায় তীব্র যুদ্ধে ফিরে আসা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সমন্বয় করে হয়েছে। ইসরায়েল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনকে ইসরায়েলের প্রতি অটুট সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে। ইসরায়েল সরাসরি যুদ্ধবিরতি শেষ ঘোষণা না করলেও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাজায় হামলা চলবে। আল জাজিরা জানিয়েছে — কয়েকজন ইসরায়েলি বিশ্লেষক, রাজনৈতিক বিরোধী দল ও নেতানিয়াহুর নিজ সরকারের কয়েকজন সদস্য বলেছেন যে এটি আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল—যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ফিরে যাওয়া।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বেশ কিছু কারণে ইসরায়েল হামলা শুরু করেছে। একটি কারণ হিসেবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা চাইছে হামাসের হাতে বন্দী সব ইসরায়েলিকে ছেড়ে দিতে হবে। এই শর্ত না মানায় আইডিএফ হামলা শুরু করেছে। তবে হামাস ইসরায়েলের এই দাবি খারিজ করেছে। তারা বলছে, এখন যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে ঢোকার কথা। এই ধাপে ইসরায়েলি বাহিনী গাজার পুরো নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার কথা। তবে আইডিএফ এই নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না বলে হামলা শুরু করেছে। এদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া এবং আইডিএফ সদস্যদের উপস্থিতি কমে যাওয়ার পর নতুন করে যোদ্ধা নিয়োগ দেওয়া শুরু করে হামাস। তবে ইসরায়েল চাইছে না, হামাস তার শক্তি ফেরত পাক।
যুদ্ধবিরতি ভাঙার আরেকটি কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ইসরায়েলের এই অভিযান বা নতুন করে হামলা শুরুর পেছনে ট্রাম্পের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। আর এ কারণেই হামলা শুরু করেছে আইডিএফ। এর বাইরে নেতানিয়াহুর ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার বিষয়টিও রয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পার্লামেন্টে ভোট হবে। এই ভোটে কট্টর ডানপন্থীদের সমর্থন পেতে হামলা শুরু করেছেন তিনি। অন্য দিকে আরেক কারণ হলো, দুর্নীতির অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিচার চলছে। গতকাল মঙ্গলবার এই মামলায় আদালতে হাজিরা দেওয়ার কথা ছিল নেতানিয়াহুর। ইসরায়েলের গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, যুদ্ধ নতুন করে শুরু হওয়ায় তিনি আদালতে হাজির হননি।
আইডিএফ জানিয়েছিল, তারা হামাসের অবস্থান লক্ষ করে হামলা চালিয়েছে। হামলার পর হামাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলায় গাজায় তাদের সরকারের প্রধান এসাম আল-দালিস মারা গেছেন। এ ছাড়া সেখানকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আবু ওয়াতফা এবং গাজার নিরাপত্তা বিভাগের মহারিচালক আবু সুলতান নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল হামাসের যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপের মেয়াদ শেষ হয়েছে এ মাসের শুরুতে। প্রথম ধাপের পর দ্বিতীয় ধাপ শুরুর কথা থাকলেও বেঁকে বসে ইসরায়েল—জানায়, দ্বিতীয় ধাপের বাস্তবায়ন নয়, প্রথম ধাপের মেয়াদ বাড়াতে আগ্রহী তারা। এই প্রস্তাব হামাস মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মানবিক ত্রাণসহ গাজায় সব ধরনের পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো এই হামলা নিয়ে নীবর রয়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। এ ছাড়া জাতিসংঘ এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। কাতারভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, পুরো উপত্যকার আকাশ ছেয়ে রেখেছে ইসরায়েলের ড্রোন। স্থানীয়রা বলছেন, অসংখ্য ড্রোনের কারণে গাজার আকাশ মেঘলা দেখাচ্ছে, ড্রোনের পাখার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে পুরো উপত্যকা থেকেই। উপত্যকার কোনো স্থানই নিরাপদ নয় জেনেও জীবন বাঁচাতে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করছে বাসিন্দারা।


