১৯৯৮ সালে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভগেনি প্রিমাকভ রাশিয়া, ভারত ও চীনের ত্রিমুখী জোট গড়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, যা মার্কিন একাধিপত্যের বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল। ২০০০-এর দশকে এ উদ্যোগ কিছুটা এগুলেও পরবর্তীতে চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষসহ বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে তা হিমঘরে পড়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক মার্কিন শুল্ক নীতির প্রভাবে আবারও এই ত্রিমুখী জোট গঠনের সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক-ঝড় ও কূটনৈতিক চাপের কারণে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক বর্তমানে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। বিশেষত রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল কেনার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন শুল্ক আরোপ করায় ভারতকে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যেখানে হয়তো দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতার পথ অনুসরণ করতে বাধ্য হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ভূমিকা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
২০২০ সালের চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা অবনতি হয়েছিল। তবে এবার চলতি মাসের শেষে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীনে গিয়ে শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠক করার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলানোর সূচনা হতে পারে। এর পাশাপাশি মানস সরোবর যাত্রা পুনরায় শুরু এবং পর্যটক ভিসা প্রদানও শুরু হয়েছে, যা সম্পর্কের ইতিবাচক সংকেত।
মার্কিন শুল্কের জেরে ভারতীয় পণ্যে মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ধীরগতি আসতে পারে, নতুন অস্ত্র কেনার পরিকল্পনা স্থগিত হয়েছে এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও চাপ তৈরি হয়েছে। ভারতের এই অসন্তুষ্টি প্রকাশ পাওয়াই এখনো এর প্রাথমিক চিহ্ন।
রাশিয়া এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। মস্কো ভারতের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছে, যার মধ্যে এস-৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য। রাশিয়া-ভারত-চীন ত্রিপাক্ষিক জোট পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা নতুন করে জোরালো হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কূটনৈতিক বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে।
কার্নেগি এনডাউমেন্টের সিনিয়র ফেলো অ্যাশলি টেলিস বলেন, ‘ভারত এখন এক ফাঁদে রয়েছে। ট্রাম্পের চাপে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমালে সেটা ট্রাম্পের ব্ল্যাকমেইলের মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে, যা গত ২৫ বছরের কূটনৈতিক সাফল্যকে উল্টে দিতে পারে।’
আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, যদি ভারত যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপের মুখে চীন ও রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি চীনের প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ করে দেবে, যা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য হুমকি।
সাবেক মার্কিন দূত নিকি হ্যালি সতর্ক করে বলেছেন, ‘চীনের প্রতি নরম হয়ে ভারতের মতো শক্তিশালী মিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা উচিত নয়।’ এ অবস্থায় ভারত দুই ধ্রুবকের মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারাটা অত্যন্ত জরুরি।
মার্কিন শুল্ক নীতি এবং কূটনৈতিক চাপ শুধু ভারত-মার্কিন সম্পর্ককে নয়, বরং চীন-ভারত-রাশিয়া ত্রিপাক্ষিক জোট গঠনের সম্ভাবনাকেও উসকে দিচ্ছে। এ অবস্থার বাস্তবায়ন এশিয়ার কৌশলগত পরিমণ্ডলে বড় পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নতুন করে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।


