মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (Fed) এবং এর স্বাধীনতা বর্তমানে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন এক উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফেডকে নিজের মতো পরিবর্তন করার প্রচেষ্টা এবং সুদের হারে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টার প্রেক্ষাপটে, বিশ্বের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোরও উদ্বেগ বেড়েছে।
ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ফেডের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া এবং বোর্ডের অন্য সদস্য লিসা কুককে অপসারণের প্রচেষ্টা এই উদ্বেগের মূল। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা যদি প্রভাবিত হয়, তবে এটি বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে। ইউরোপ, জাপানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক চাপের মুখে নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ECB) নীতি নির্ধারক ওলি রেহ্ন বলেন, “ফেডের উপর রাজনৈতিক আক্রমণের প্রভাব বিশ্বব্যাপী অনুভূত হবে। এটি ইউরোপসহ অন্যান্য অঞ্চলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।” এই কারণেই রেহ্ন এবং অন্যান্য ব্যাংক কর্মকর্তারা পাওয়েলকে দৃঢ় থাকা ও নীতি রক্ষায় সমর্থন করেছেন।
ফেডের স্বাধীনতা হারানো মানে কেবল মার্কিন অর্থনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি। বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের ঝুঁকি মূল্যায়ন পুনর্বিবেচনা করতে পারে এবং ট্রেজারি সিকিউরিটিজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। এটি বিনিয়োগের প্রিমিয়াম বাড়িয়ে এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে দম বন্ধ করা অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে।
যদিও মার্কিন শেয়ারবাজারে এখনও তাৎক্ষণিক উদ্বেগ দেখা যায়নি, ডাউ জোন্স, S&P 500 এবং নাসডাক সূচক ইতিমধ্যেই বৃদ্ধি পেয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা ফেডের স্বাধীনতার ক্ষয়কে একটি গুরুতর সঙ্কেত হিসেবে বিবেচনা করছেন।
ফেডের নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে চেয়ারম্যান পল ভোলকারের সময় থেকে শুরু হওয়া স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি অর্জনের এক দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া বজায় রেখেছে। এরপর থেকে বিশ্বের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও ফেডের মডেল অনুসরণ করেছে। রাজনীতির হস্তক্ষেপ থেকে দূরে থেকে তাদের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন এবং মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপর রাজনৈতিক চাপ অনেক দেশে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্সে রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা এবং লাটভিয়ার ও স্লোভেনিয়ার মতো দেশে গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়ার জটিলতা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য। জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন, যা অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ফেডের উপর ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ যদি সফল হয় তবে এটি অন্যান্য দেশের সরকারগুলোর জন্য খারাপ নজির স্থাপন করবে।আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বাজারের অস্থিরতার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেতে পারে। পিটারসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মৌরি ওবস্টফেল্ড বলেন, “যদি যুক্তরাষ্ট্রের মতো সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়, তবে অন্যান্য দেশের জন্যও কেন্দ্রীয় ব্যাংক দখলের পথ সহজ হয়ে যাবে।”
ফেডের স্বাধীনতা শুধুমাত্র মার্কিন অর্থনীতির জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বব্যাপী আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা যে, তাদের নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা কখনোই স্বাভাবিক ভাবেই ধরা যাবে না এবং তা রক্ষা করতে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।


