বুধবার (২৫ জুন) নেদারল্যান্ডের দ্য হেগে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে — জোটের সদস্য ৩২টি রাষ্ট্র ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির প্রতিরক্ষায় ব্যয় করবে৷ যা আগের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি, এতদিন এই হার ছিল ২%৷
প্রথম এই ৫% লক্ষ্যমাত্রার চাপ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প৷ তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তারা যদি ‘কম’ ব্যয় চালিয়ে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা প্রত্যাহার করে নেবে৷ ২০২৪ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই ন্যাটোর মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশ মিটিয়েছে৷
অনেক ইউরোপীয় দেশ ট্রাম্পের দাবির বিরোধিতা করেছে এবং বলেছে যে ৫% হার খুব বেশি৷ ২০২৪ সালে অনেক দেশ এখনো ২% লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করতে পারেনি৷
যৌথ ঘোষণায় ন্যাটো বলেছে, ‘গভীর নিরাপত্তা হুমকি ও চ্যালেঞ্জের মুখে আমরা ঐক্যবদ্ধ।’ বিশেষ করে ইউরো-অ্যাটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী হুমকি এবং সন্ত্রাসবাদের ‘অব্যাহত হুমকির’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা হ্রাসের হুমকি দিয়েছেন।
এই ৫% মধ্যে অন্তত ৩.৫% ব্যয় করা হবে সরাসরি প্রতিরক্ষার জন্য, বাকি অর্থ ব্যয় করা হবে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত ‘গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো’, সাইবার নিরাপত্তা, নাগরিক প্রস্তুতি, উদ্ভাবন এবং প্রতিরক্ষা শিল্প খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য।
শীর্ষ সম্মেলনে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক অগ্রগতি’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের সম্মিলিত প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কেবল নিরাপত্তা বৃদ্ধি করবে না, বরং কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করবে।’
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা সতর্ক করে বলেছেন — এই বিপুল সামরিক ব্যয়ের ফলে পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, পরিচর্যা ও শিক্ষা খাতে সরকারের ব্যয় কমে যেতে পারে।
ইউরোপের দেশগুলোর সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি হলে তাতে মার্কিন অস্ত্রশিল্প মূলত লাভবান হবে। এর মধ্যেই ন্যাটো সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাজ্য ১২টি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কিনতে যাচ্ছে।
নেদারল্যান্ডসের হ্যাগ শহরে অনুষ্ঠিত এবারের ন্যাটো সম্মেলনকে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বলে অভিহিত করা হচ্ছে। মাত্র দুই ঘণ্টা ৩০ মিনিট স্থায়ী এই সম্মেলনের ব্যয় হয়েছে ২১৪৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি মিনিটে খরচ হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি ২৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। বিপুল ব্যয় নিয়ে ইউরোপজুড়ে শুরু হয়েছে সমালোচনার ঝড়।
সুইডেনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) বলেছে — শীতল যুদ্ধের শেষ সময়ের পর থেকে বিশ্ব এখন সবচেয়ে দ্রুতগতিতে অস্ত্র মজুদের দিকে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ৯.৪% বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭১৮ ট্রিলিয়ন ডলারে। এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ব্যয়ের রেকর্ড।
সিপ্রির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে সামরিক খাতে। সামরিক খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্র একা যে ব্যয় করে, তালিকার পরবর্তী ৯টি দেশের সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়েও তা বেশি। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক খাতে চীনের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ এবং রাশিয়ার চেয়ে প্রায় ৭ গুণ বেশি ব্যয় করে। সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে এরপরই রয়েছে রাশিয়া, ভারত, সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্য।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বব্যাপী এই অস্ত্র প্রতিযোগিতার শেষ এখনও চোখে পড়ছে না। ২০২৪ সালে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ তাদের সামরিক খরচ বৃদ্ধি করেছে।
সিপ্রি সতর্ক করেছে যে, সামরিক খাতে অতিরিক্ত ব্যয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ এটি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাজেট হ্রাসের দিকে পরিচালিত করে।
২০২৫ সালের গ্লোবাল পিস ইনডেক্সে দেখা গেছে – বৈশ্বিক শান্তি অব্যাহতভাবে হ্রাস পাচ্ছে, এবং যুদ্ধ-পূর্ববর্তী প্রধান সূচকগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে। আরও অনেক দেশ সামরিকীকরণ বৃদ্ধি করছে, যার পেছনে রয়েছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘাত বৃদ্ধি, ঐতিহ্যগত জোট ভাঙন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।


