ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিল ভারতের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের নেপথ্যে যা

একবছর আগে থেকেই ভারতের রফতানিকারকরা দিল্লি হয়ে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির বিরোধিতা করে আসছিলেন। তাদের দাবি ছিল, দিল্লি বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক কার্গো টার্মিনালে বাংলাদেশি পণ্যবাহী ট্রাকের ভিড় এত বেড়ে গেছে যে, বিভিন্ন এয়ারলাইনের কার্গোতে তাদের স্লট পাওয়াই মুশকিল হয়ে গেছে এবং হ্যান্ডলিং এজেন্টরাও সুযোগ বুঝে তাদের বাড়তি মাশুল চার্জ করছেন! নিজ দেশের ব্যবসায়ীদের এমন দাবির পরও দেশটির সরকার তখন কোনও উদ্যোগ নেয়নি। একবছর পর দুই দেশের সরকার প্রধানের বৈঠকের ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় ভারত এমন সিদ্ধান্ত নিলো।

২০২০ সালের জুন মাসে কোভিড মহামারির লকডাউনের সময় ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রতিবেশী বাংলাদেশের রফতানিকারকরা চাইলে ভারতের বন্দরগুলো ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে তাদের পণ্য পাঠাতে পারবে – অর্থাৎ এই বন্দরগুলোকে ‘ট্রান্সশিপমেন্ট হাব’ হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে। অবশ্য শুরুতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা এই সুবিধা খুব একটা ব্যবহার করেননি। ২০২৩ সালের শেষ তিন কোয়ার্টারেও (এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর) দিল্লি বিমানবন্দর দিয়ে যত পণ্য রফতানি হয়েছিল তার মাত্র ২% ছিল বাংলাদেশের।কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক ২০২৪ থেকে এই প্রবণতা বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশি রফতানিকারকরা অনুধাবন করেন, দিল্লি বিমানবন্দর দিয়ে এয়ার কার্গো পাঠানোর অপশন অনেক বেশি। খরচও ঢাকা বা চট্টগ্রামের তুলনায় অনেক কম। তা ছাড়া তখন লোহিত সাগরে অস্থিরতা চলায় সমুদ্রপথে পণ্য পাঠাতে কেপ অব গুড হোপ হয়ে অনেক বেশি সময় লাগছিল, কাজেই আকাশপথে রফতানির চাহিদাও বাড়ছিল। গত বছরের শুরু থেকেই রোজ ৩০ থেকে ৩৫টি বাংলাদেশি পণ্যবাহী ট্রাক বেনাপোল সীমান্ত পেরিয়ে দিল্লি বিমানবন্দরে আসতে শুরু করেছে। ওই বছরের প্রথম কোয়ার্টারে দিল্লি দিয়ে যে প্রায় ৯০ হাজার মেট্রিক টন পণ্য আকাশপথে রফতানি করা হয়, তার প্রায় ১০%-ই ছিল বাংলাদেশের।

এই ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ব্যাখ্যা দিলেন বাংলাদেশকে এই সুবিধা দেওয়ার ফলে ভারতের বন্দরগুলোতে যে ‘কনজেসশন’ ও ‘ব্যাকলগ’ তৈরি হচ্ছিল, সেটা দূর করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুখপাত্র অবশ্য এটাও জানালেন, নেপাল ও ভুটানের মতো দেশে ভারতের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের রফতানি যেমন চলছিল সেটা তেমনই চলতে পারবে। এই একই পরিস্থিতি তো গত বছরের এই সময়েও ছিল … তাহলে তখন ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা বহাল রাখলেও এখন রাতারাতি তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হল কেন? এর জবাবে দিল্লির পর্যবেক্ষকরা দুটো কারণ দেখাচ্ছেন এক. এখন বাংলাদেশে যে সরকার ক্ষমতায় রয়েছে তাদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আর তত বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। আর দুই. অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় করা একটি মন্তব্য।

প্রথম কারণটি অবশ্য আজ নয়, গত আট মাসের ওপর ধরেই আছে। কিন্তু বেজিংয়ে চীনের বাণিজ্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক সভায় অধ্যাপক ইউনূস ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন সেটাই যে আসল ট্রিগারের কাজ করেছে তাতে তাদের কোনও সন্দেহ নেই! ঢাকায় ভারতের হাই-কমিশনার ছিলেন, এমন একজন সাবেক শীর্ষ কূটনীতিবিদ বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদককে ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন এভাবে, ‘ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধাটা আসলে কী? এটা হল ভারতের ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত সুবিধাটা একটা বন্ধু দেশকে ব্যবহার করতে দেওয়া! এখন সেই প্রতিবেশী যদি সেভেন সিস্টার্সের কথা তুলে সেই ভূগোলকেই ভারতের দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরতে চায়, তাহলে এই ধরনের পাল্টা পদক্ষেপই প্রত্যাশিত নয় কি?’





LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন