টিকটক এবং প্রযুক্তিগত বৈশ্বিকীকরণ এক নতুন রাজনৈতিক লড়াই

২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি রাত ১০:৩০ টার দিকে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম TikTok মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় চৌদ্দ ঘণ্টা পর্যন্ত আমেরিকান ব্যবহারকারীরা TikTok ব্যবহার করতে পারেনি। তবে কিছু সময় পর এটি পুনরায় চালু হয়, কিন্তু এই ছোট্ট সময়ের বন্ধের পরও, TikTok এবং তার চীনা প্রতিষ্ঠান ByteDance খুব বড় ধরনের কোনো ফলস্বরূপ পরিণতি ভোগ করেনি। তবে গত বছর এপ্রিল মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একটি আইন স্বাক্ষর করেছিলেন, আমেরিকান অংশীদারদের কাছে অন্তত কিছু অংশে TikTok-কে বিক্রি করতে হবে, অথবা এটি যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করা হবে। এই আইনের ফলে TikTok এবং ByteDance এর সামনে এক নতুন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথগ্রহণের আগে তিনি TikTok এবং তার সমর্থক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলিকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিনি TikTok নিষিদ্ধ করবেন না, যদিও তার প্রথম প্রশাসনই TikTok-এর উপর চীনা সরকারের প্রভাবের কারণে একটি কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল। ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশ জারি করেন, যেটি TikTok-এর সময়সীমা ৭৫ দিন বাড়িয়ে দেয়। এই সিদ্ধান্তের পর, ৪ এপ্রিল ট্রাম্প আবার ৭৫ দিন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, ফলে TikTok এর অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে।

ByteDance এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি শীঘ্রই হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল, যা একটি মার্কিন স্পিনঅফ কোম্পানির মাধ্যমে TikTok-এর মালিকানা শেয়ার পুনর্বিন্যস্ত করবে। কিন্তু গত সপ্তাহে, ট্রাম্প যখন এক বৈশ্বিক শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণা দেন, চীনা পক্ষ চুক্তি চূড়ান্ত করতে আগ্রহী হয়নি। ট্রাম্প বলেন, ‘চীন শুল্কের কারণে চুক্তি পরিবর্তন করেছে। যদি আমি শুল্ক কিছুটা কমিয়ে দিই, তারা ১৫ মিনিটের মধ্যে চুক্তি অনুমোদন করবে।’

TikTok এর এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র একটি সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মের সংকট নয়; এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক লড়াইয়ের প্রতিফলন। TikTok বর্তমানে এক ধরণের প্রযুক্তিগত অস্থিরতায় রয়েছে। এটি একদিকে কার্যকর এবং অন্যদিকে কার্যকরীভাবে অবৈধ। এই লড়াই শুধু একটি অ্যাপের ভবিষ্যত নিয়ে নয়, বরং প্রযুক্তি ও তথ্যের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য এক বৃহত্তর দ্বন্দ্বের অংশ।

বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি গত কয়েক দশকে বৈশ্বিকীকরণের শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। গুগল, ফেসবুক, এবং অ্যাপল এর আইফোন ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষ তাদের ডিজিটাল জীবন চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলির সফলতা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এক সময়ে মার্কিন সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলি ম্যাকডোনাল্ডস বা স্টারবাক্সের মতো আন্তর্জাতিক চেইনগুলির মতো বৈশ্বিক প্রসার লাভ করেছিল। এইভাবে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি বৈশ্বিক শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

তবে আজকের বিশ্বে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলির উপর জাতীয়তাবাদী এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। একদিকে প্রযুক্তি শিল্প বিশ্বের নানা দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারগুলি এসব কোম্পানির প্রযুক্তিকে তাদের নিজস্ব জাতীয় আগ্রহে ব্যবহারের চেষ্টা করছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে প্রযুক্তিগত আধিপত্যের জন্য একটি বড় যুদ্ধ চলছে। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক লড়াই নয়, বরং একটি রাজনৈতিক লড়াইও।

এরই মধ্যে হংকংয়ের দার্শনিক ইউক হুই তার ‘Machine and Sovereignty’ বইয়ে প্রযুক্তিগত বৈশ্বিকীকরণের বিপরীতে ‘টেকনোেডাইভার্সিটি’ নামে একটি নতুন ধারণা প্রস্তাব করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তিগত বৈশ্বিকীকরণের পরিবর্তে, একাধিক প্রযুক্তি একে অপরের সাথে সহাবস্থান করতে পারে, প্রতিটি প্রযুক্তি তার নিজস্ব ডিজাইন এবং অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। এটি একটি নতুন ধরনের ডিজিটাল প্রতিযোগিতা এবং সঞ্চালনের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যেখানে একাধিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা করবে এবং বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে।

TikTok-এর ওপর যে আলোচনা চলছে, তা শুধুমাত্র একটি অ্যাপের ভাগ্য নির্ধারণ করছে না, বরং একটি বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ, প্রযুক্তির উপর রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। TikTok-এর বিক্রির বিষয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, তা বাস্তবতায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে আধিপত্যের লড়াইয়ের প্রতিফলন। একদিকে আমেরিকা চাইছে TikTok এর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে, অন্যদিকে চীনও এর প্রযুক্তির ওপর তাদের প্রভাব বজায় রাখতে চায়। বিশেষ করে TikTok-এর বিষয়ে এই লড়াই, প্রযুক্তির ভবিষ্যত এবং তার নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। যদি সত্যিই ‘টেকনোেডাইভার্সিটি’ বা প্রযুক্তিগত বৈচিত্র্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে এটি বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন ধরনের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যেখানে একাধিক দেশ এবং তাদের প্রযুক্তি কোম্পানি নিজেদের মতো করে প্রযুক্তি তৈরি এবং ব্যবহার করবে।



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন