টিএস এলিয়টের দৃষ্টিতে শেকসপিয়রের ‘হ্যামলেট’ একটি ব্যর্থ শিল্প

উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর সাহিত্য-জগতে টিএস এলিয়ট (T. S. Eliot) ছিলেন আধুনিকতাবাদের অগ্রপথিক, যার কবিতা, প্রবন্ধ এবং সাহিত্যতত্ত্ব নতুন একটি ধারা তৈরি করে। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “Hamlet and His Problems” এ তিনি সাহসিকতার সঙ্গে দাবি করেন, “Hamlet is most certainly an artistic failure.” এটি শুধু শেকসপিয়রের সমালোচনার সাহসী ভাষ্যই নয়, বরং একটি নতুন তাত্ত্বিক কাঠামো , “objective correlative” ― এর মাধ্যমে নাট্য বিশ্লেষণে এক নতুন দ্বার উন্মোচন।

হ্যামলেট নাটকের সমস্যাটি কোথায়?
টিএস এলিয়টের মতে, হ্যামলেট নাটকের মূল সমস্যা চরিত্রের মধ্যে নয়, বরং পুরো নাটকটির গঠন ও নাট্যশৈলীতে। তিনি মনে করেন শেকসপিয়র এই নাটকে এমন একটি মানসিক জটিলতা উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, যা নাট্যকার নিজেও সম্পূর্ণভাবে ধরতে পারেননি। ফলাফলস্বরূপ নাটকটির আবেগ-প্রবাহ ও দর্শকের অনুভূতি দুইই বিছিন্ন হয়ে পড়ে।

এলিয়ট বলেন, সমালোচকেরা হ্যামলেট চরিত্রে নিজেদের আবেগ ও মনস্তত্ত্ব আরোপ করে ফেলেন, ফলে নাটকটির নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ব্যাহত হয়।জার্মান কবি গ্যেটে ও ইংরেজ কবি কোলরিজ এই ভুল করেছেন বলেও এলিয়ট তীব্র সমালোচনা করেন। গ্যেটে হ্যামলেটকে নিজের ‘Werther’-এর মত করে দেখেছেন এবং কোলরিজ তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব মিশিয়ে হ্যামলেট চরিত্রে এক ধরণের রোমান্টিক আবরণ তৈরি করেছেন।

এটি এলিয়টের দৃষ্টিতে সৃজনশীল সমালোচনার এক ধরনের বিপজ্জনক পথ, যেখানে সমালোচক আসলে লেখকের নয়, বরং নিজের মনোজগৎ প্রকাশ করেন।

এলিয়ট উল্লেখ করেন, হ্যামলেট নাটকের উৎস সম্ভবত থমাস কিডের The Spanish Tragedy ও একটি “Ur-Hamlet” নাটক, যেটিও কিডের লেখা বলে ধারণা করা হয়। এসব পুরনো সংস্করণে হ্যামলেটের মূল মোটিভ ছিল প্রতিশোধ এবং পাগলামির ভান ছিল কৌশলগত। কিন্তু শেকসপিয়র সেই কাঠামো ধরে রাখলেও চরিত্রকে দেন গভীর মানসিক দ্বিধা, যার ব্যাখ্যা অনুপস্থিত।

এলিয়ট মনে করেন, শেকসপিয়র নতুন একটি আবেগগত মোটিভ (যেমন: মায়ের প্রতি বিতৃষ্ণা) যোগ করলেও সেটিকে নাট্যরূপ দিতে পারেননি। এই অসম্পূর্ণ সংমিশ্রণ নাটকটিকে দুর্বল করেছে। তাঁর ভাষায়, নাট্যকার চরিত্রের আবেগ প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন কারণ তিনি আবেগের জন্য যথাযথ বাইরের অবজেক্ট বা পরিবেশ খুঁজে পাননি। এলিয়টের বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়, নাটকের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিশোধ নয় বরং গার্ট্রুডের আচরণজনিত এক ধরণের অস্পষ্ট মানসিক অস্বস্তি রয়েছে, যার রূপায়ন নাট্যে অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। এই অস্পষ্টতা নাটকটিকে একটি “incoherent artistic unity” বানিয়ে তোলে।

এলিয়ট তাঁর বিখ্যাত তত্ত্ব “Objective Correlative” (উদ্দীপক সমান্তরাল) ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, আবেগ প্রকাশের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো “একগুচ্ছ বস্তু, পরিস্থিতি বা ঘটনার মাধ্যমে সেই আবেগকে স্পষ্ট করা”। নাট্যকার যদি দর্শকের সামনে এমন পরিস্থিতি হাজির করতে পারেন, যার সঙ্গে আবেগ জুড়ে যায়, তাহলে চরিত্রের মানসিক অবস্থা দর্শকের মনে বাস্তবভাবে প্রতিফলিত হয়। হ্যামলেটের ক্ষেত্রে এই অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। এলিয়ট বলেন, হ্যামলেটের মূল দ্বন্দ্ব হলো মায়ের প্রতি তার ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা। কিন্তু এই আবেগ নাটকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। গার্ট্রুড চরিত্র একা এই মানসিক বিপর্যয় ধারণ করতে পারেনি। ফলে দর্শক আবেগের মূল উৎস বুঝে উঠতে পারে না। এই ব্যর্থতা এলিয়টের ভাষায়, শেকসপিয়রের নিজেরও এক ধরণের “emotional incomprehension”-এর ফলাফল।

এবং এখানেই এলিয়ট এক তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রবর্তক হয়ে ওঠেন, যা পরবর্তীতে New Criticism ধারার ভিত্তি গড়ে তোলে। তার মতে সাহিত্য বিশ্লেষণে লেখকের মানসিকতা নয়, বরং পাঠ্য-পাঠ ও কাঠামোগত সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ।

এলিয়ট হ্যামলেটকে artistic failure বললেও তিনি শেকসপিয়রের অন্যান্য নাটকে Objective Correlative এর সফল প্রয়োগ স্বীকার করেন।Macbeth নাটকে লেডি ম্যাকবেথের ঘুমের ঘোরে কথা বলা দৃশ্য, যেখানে রক্তের গন্ধ, ধোয়া না যাওয়া দাগ ইত্যাদির মাধ্যমে তার মানসিক পীড়া অনুভব করা যায়। এখানে শেকসপিয়র সফলভাবে আবেগকে বাইরের জগতে রূপান্তরিত করেছেন।

এলিয়টের এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করে। অনেক সমালোচক বলেন, এলিয়ট নিজেই হ্যামলেট চরিত্রের ওপর অতিরিক্ত জোর দিয়েছেন, যেটা তিনি অন্যদের সমালোচনার ক্ষেত্রে দোষারোপ করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন, “Hamlet and His Problems” শিরোনাম হওয়ার বদলে এটি হওয়া উচিত ছিল “Hamlet and Its Problems”। তাছাড়া এলিয়ট যেভাবে আবেগের সঠিক প্রকাশ খোঁজেন, তা নিয়েও আপত্তি আছে। সমালোচকেরা বলেন, শেকসপিয়র আসলে হ্যামলেটের বিভ্রান্তি ও জটিলতাকে নাটকীয় অস্তিত্ব দিয়েছেন এটা কোনো ব্যর্থতা নয় বরং একটি কৌশল। তাদের মতে একটি চরিত্রের আবেগ যদি জটিল হয়, তাহলে তার জন্য একটি বিশুদ্ধ অবজেকটিভ কোরেলেটিভ খোঁজাও একধরনের সরলীকরণ। শেকসপিয়রের হ্যামলেট সেই অস্পষ্ট, জটিল, দ্বিধাগ্রস্ত মানবিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি।

টিএস এলিয়টের “Hamlet and His Problems” প্রবন্ধ কেবল একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ নয়, বরং সাহিত্যে আবেগ প্রকাশ ও পাঠক-প্রতিক্রিয়ার তত্ত্ব নিয়ে এক যুগান্তকারী ভাবনা। তাঁর মতামত বিতর্কিত হলেও সাহিত্যে “objective correlative” ধারণাটি আজও আলোচ্য এবং প্রয়োগযোগ্য। শেকসপিয়রের হ্যামলেট যদি এক ধরণের বিভ্রান্তি হয়, তবে এলিয়ট সেই বিভ্রান্তিকে এক নতুন ভাষা দিয়েছেন, যাতে আমরা নাট্যশিল্পের গভীরতর প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবতে পারি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন