জ্যোতিষশাস্ত্র কি ভুল ? কার্লসনের গবেষণা যা বলছে

জ্যোতিষশাস্ত্র হাজার বছর ধরে মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এটি ভাগ্যের পূর্বাভাস এবং ব্যক্তিত্বের বিশ্লেষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে জ্যোতিষশাস্ত্র কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। এই বিতর্কের মীমাংসার জন্য সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হলো ১৯৮৫ সালে বিশ্বখ্যাত সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত শোন কার্লসনের ডাবল ব্লাইন্ড পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা যায়, জ্যোতিষীরা বার্থ চার্টের ভিত্তিতে ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করতে পারেননি, তাদের অনুমান ছিল শুধুই র‍্যান্ডম চান্সের সমান!

শোন কার্লসনের গবেষণা কঠোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছিল, যাতে পক্ষপাতের সম্ভাবনা কম থাকে। এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল জ্যোতিষশাস্ত্রের দাবিগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করা। তিনি পরীক্ষা পরিচালনার জন্য দুইটি পৃথক দল গঠন করেন।প্রথমে ছিলো, অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা যাঁদের জন্মছক তৈরি করা হয়। এর পরে ছিলো পেশাদার জ্যোতিষীরা, যাঁরা জন্মছকের ভিত্তিতে ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করবেন। এই গবেষণায় অংশগ্রহণ করেন ২৮ জন পেশাদার জ্যোতিষী, তারা আমেরিকার প্রধান জ্যোতিষ সমিতিগুলোর অনুমোদিত সদস্য ছিলেন। অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের থেকে জন্মতারিখ, সময় ও স্থানের তথ্য নিয়ে তাদের জন্মছক প্রস্তুত করা হয়।

এরপর প্রতিটি ব্যক্তির জন্য তিনটি সম্ভাব্য ব্যক্তিত্ব বর্ণনা তৈরি করা হয়, একটিকে নির্দিষ্ট ব্যক্তির আসল মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ হিসেবে রাখা হয়। বাকি দুটি ছিল একইরকমভাবে প্রস্তুত করা কিন্তু এলোমেলোভাবে নির্বাচিত। জ্যোতিষীদের কাজ ছিল তিনটি বিকল্পের মধ্যে সঠিকটি চিহ্নিত করা। কার্লসনের গবেষণার ফলাফল ছিল স্পষ্ট, সেখানে জ্যোতিষীরা দৈবচয়নের চেয়ে ভালো কোনো পূর্বাভাস দিতে পারেননি। তিনটি বিকল্পের মধ্যে সঠিকটি চিহ্নিত করার সম্ভাব্য হার ছিল ৩৩.৩% এবং জ্যোতিষীদের সাফল্যের হারও এই সম্ভাব্য হার থেকে ভিন্ন ছিল না। এর অর্থ হলো জ্যোতিষীদের অনুমান করার ক্ষমতা কোনোভাবেই জন্মছক থেকে প্রাপ্ত তথ্যের উপর নির্ভরশীল ছিল না বরং তারা কেবল অনুমানের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন।

এই গবেষণার ফলাফল জ্যোতিষশাস্ত্রের বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এটি বোঝা যায়, জন্মছকের ভিত্তিতে ব্যক্তিত্ব নির্ধারণের দাবি পরীক্ষার মাধ্যমে সমর্থন করা যায়নি। শোন কার্লসনের গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। জ্যোতিষশাস্ত্রের সমর্থকরা গবেষণার পদ্ধতির কঠোর সমালোচনা করেন এবং দাবি করেন পরীক্ষাটি যথাযথভাবে পরিচালিত হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা গবেষণাটিকে জ্যোতিষশাস্ত্রের অন্যতম শক্তিশালী খণ্ডন হিসেবে দেখেন, কারণ এটি দ্বৈত-অন্ধ
পরীক্ষার কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হয়েছিল। দ্বৈত-অন্ধ পদ্ধতিতে গবেষণা পরিচালনার মানে হলো, গবেষণার কোনো পক্ষই জানতো না যে কোন তথ্য আসল বা কোন তথ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি গবেষণাকে আরও নিরপেক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য করে তোলে।

জ্যোতিষশাস্ত্র বহু সংস্কৃতিতে জনপ্রিয় হলেও এটি বিজ্ঞানের পরীক্ষার সামনে টিকতে পারেনি। বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি হলো পুনরাবৃত্তি এবং যাচাইযোগ্যতা। কোনো তত্ত্ব বা পদ্ধতি যদি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিবার সঠিক ফলাফল না দিতে পারে, তবে বিজ্ঞান সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য বলে গ্রহণ করে না। জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রধান সমস্যা হলো এটি কোনো পরীক্ষামূলক ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি যার মাধ্যমে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায়। অনেক মানুষ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জ্যোতিষশাস্ত্রের উপর বিশ্বাস রাখেন, তবে এই বিশ্বাস সাধারণত প্লেসেবো প্রভাব বা বার্নাম প্রভাবের কারণে হতে পারে। বার্নাম প্রভাব হলো মনস্তাত্ত্বিক একটি প্রবণতা, যেখানে মানুষ অস্পষ্ট এবং সাধারণ বিবরণকে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে দেখে, যা প্রায় সবার ক্ষেত্রেই সত্য হতে পারে।

শোন কার্লসনের ১৯৮৫ সালের গবেষণা আধুনিক বিজ্ঞানে জ্যোতিষশাস্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করে। এটি প্রমাণ করে জন্মছকের মাধ্যমে কারোর ভবিষ্যত বা ব্যক্তিত্ব নির্ধারণ করার দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়। যদিও অনেক মানুষ এখনো জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট, তবে কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফলাফল দেখায়, এটি নিছক অনুমানের উপর নির্ভরশীল।বিজ্ঞান যেহেতু পরীক্ষা, যুক্তি ও প্রমাণের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাই কোনো বিশ্বাস যদি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় ব্যর্থ হয় তবে সেটিকে সন্দেহের চোখে দেখা স্বাভাবিক। যারা জ্যোতিষশাস্ত্রকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন, তাদের উচিত এ বিষয়ে আরও গভীর গবেষণা করা এবং বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটি বিচার করা। শোন কার্লসনের গবেষণা জ্যোতিষশাস্ত্রকে একটি কুসংস্কার হিসেবে প্রত্যাখ্যান করার জন্য পর্যাপ্ত ভিত্তি প্রদান করেছে, তবে মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সংস্কৃতি এখনও এটিকে জনপ্রিয় করে রেখেছে।





LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন