বর্তমান সমাজে দুইটি প্রজন্মের মধ্যে জীবনধারার পার্থক্য লক্ষণীয়, মিলেনিয়ালস (১৯৮১-১৯৯৬) এবং জেন Z (১৯৯৭-২০১২)। এই দুটি প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক, প্রযুক্তিগত, ও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণগত পার্থক্য দেখা যায়।
প্রযুক্তি ব্যবহারে পার্থক্য দুটি প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট। মিলেনিয়ালস সেই প্রজন্ম যারা ডিজিটাল বিপ্লবের সূচনালগ্নে জন্মগ্রহণ করেছিল, যেখানে ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছিল। তাদের জীবনে ফেসবুক এবং ইমেইল অন্যতম যোগাযোগের মাধ্যম ছিল। অন্যদিকে জেন Z প্রজন্ম পুরোপুরি স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর এবং তারা এই প্রযুক্তির ব্যবহারকে নিজেদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। Pew Research Center-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জেন Z প্রজন্মের ৯৫% সদস্য সক্রিয়ভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে এবং এটাই তাদের পরিচিতির মূল ভিত্তি। এই প্রযুক্তিগত পার্থক্য দুটি প্রজন্মের চিন্তা-ভাবনা ও জীবনধারায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
ক্যারিয়ারের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতেও মিলেনিয়ালস এবং জেন Z-এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মিলেনিয়ালস একটি স্থিতিশীল এবং প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ারকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখে, যেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কর্পোরেট চাকরি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা মনে করে একটি চাকরি তাদের জীবনে নিরাপত্তা এবং উন্নতির পথে সাহায্য করবে। অপরদিকে জেন Z প্রজন্মের মধ্যে ক্যারিয়ার সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি নমনীয় এবং ফ্লেক্সিবল। তারা সাইড-হাসল, ফ্রিল্যান্স কাজ, এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতি আগ্রহী। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে জেন Z-র ৬০% সদস্য ফ্রিল্যান্স কাজের প্রতি আগ্রহী।
মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সচেতনতা বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলেও মিলেনিয়ালসরা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে অনেকটাই লজ্জিত বা সংকোচ বোধ করত। অন্যদিকে জেন Z এই বিষয়ে অনেক বেশি খোলামেলা এবং তারা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অধিক সচেতন। তারা থেরাপি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণে আগ্রহী এবং একে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে। WHO-র রিপোর্ট অনুযায়ী জেন Z প্রজন্মের সদস্যরা উদ্বেগ এবং ডিপ্রেশন সমস্যায় বেশি আক্রান্ত, তবে তারা এই সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করতে এবং সমাধান করতেও প্রস্তুত।
ভোগবাদী চিন্তাভাবনা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। মিলেনিয়ালস সাধারণত ব্র্যান্ড কনশাস এবং ভোগবাদী ছিল, যেখানে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল উচ্চমানের পণ্য এবং অভিজ্ঞানী জীবনযাপন। তবে জেন Z প্রজন্ম পরিবেশবান্ধব এবং ইনক্লুসিভ সংস্কৃতির প্রতি বেশি মনোযোগী। তারা রিসাইক্লিং, সাসটেইনেবল ফ্যাশন এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল ব্র্যান্ডের প্রতি আগ্রহী।মিলেনিয়ালস এবং জেন Z-এর মধ্যে জীবনধারার পার্থক্য, প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন, ক্যারিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। যদিও উভয় প্রজন্মই সময়ের পরিবর্তনের সাথে নিজেদের স্থান তৈরি করেছে, তাদের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক সংলাপ রয়েছে, যা আধুনিক সমাজের দিকে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসছে।


