মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর ডালাস, টেক্সাসে এক আততায়ীর গুলিতে তার জীবন হারান। এই ঘটনাটি বিশ্ব ইতিহাসের একটি স্মরণীয় ও বিতর্কিত মুহূর্ত হয়ে আছে এবং এই দুর্ঘটনা নিয়ে পরবর্তী সময়ে একাধিক কনস্পিরেসি থিওরি উঠে এসেছে যা আজও চর্চিত। অনেকেই বিশ্বাস করেন জেএফকে হত্যার পেছনে একাধিক শক্তিশালী গোষ্ঠী ও নীতির মেকানিজম কাজ করেছে। যদিও সরকারি তদন্তে লি অসওয়াল্ড নামের এক ব্যক্তি একাই গুলি চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। তবুও একাধিক কনস্পিরেসি থিওরি আজও আলোচিত।
জেএফকে হত্যার পর অসওয়াল্ডকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাকে একাই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হয়। ১৯৬৪ সালে ওয়ারেন কমিশন এই ঘটনার তদন্ত শুরু করে এবং তাদের রিপোর্টে বলা হয় অসওয়াল্ড একাই গুলি চালিয়েছে তবে অনেকের মতে এই তদন্তে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা হয়েছে অথবা আসল তথ্যকে বিকৃত করা হয়েছে।’ডিপ স্টেট’ থিওরি অনুযায়ী জেএফকে হত্যার পেছনে মার্কিন সরকারের একটি অদৃশ্য শক্তি কাজ করেছে। এটি এমন একটি গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে যারা সরকারী কাঠামোর বাইরের কিন্তু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রভাবিত থাকে। অনেকেই বিশ্বাস করেন প্রেসিডেন্ট কেনেডি একাধিক ইস্যুতে, যেমন ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, সিআইএ ও মাফিয়া সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াসহ আরো নানা কারণে এই শক্তিগুলির বিরাগভাজন হন এবং তারা তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। সিআইএ এবং মাফিয়া সংস্থা যে একযোগে কাজ করেছিলন বলে দাবিও ওঠে।
কিছু তত্ত্ব অনুসারে, মাফিয়া সংস্থা জেএফকে হত্যার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রেসিডেন্ট কেনেডি তার ভাই রবার্ট কেনেডিকে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেন যেটি মাফিয়া সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। বিশেষ করে ১৯৬১ সালে কিউবা আক্রমণের ঘটনা এবং তার পরবর্তী সময়ে কিউবা সম্পর্কিত নীতি মাফিয়াদের জন্য এক বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।মাফিয়া এবং সিআইএ উভয়ই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চাইত এবং তার ফলস্বরূপ তারা হয়ত জেএফকে হত্যার পরিকল্পনা করে!
একটি অন্যতম শক্তিশালী থিওরি হল সিআইএ এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত। অনেকেই বিশ্বাস করেন জেএফকে যদি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতেন তবে তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ কমিয়ে দিতেন বা এমনকি যুদ্ধ থেকেও সরে আসতেন।সিআইএ এবং যুদ্ধের পৃষ্ঠপোষকরা এই পরিবর্তন চাইতেন না কারণ এটি তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের বিপক্ষে যেত। তাই তারা এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে জেএফকেকে সরিয়ে দেয়।
যদিও লি হারভে অসওয়াল্ডকে হত্যার জন্য একমাত্র দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তবে তার ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন অসওয়াল্ডকে একজন পটভূমি চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং তাকে হত্যাকাণ্ডের জন্য ‘পাতাল’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। তার সম্পর্কিত নানা তথ্য ঘিরেও নানা অস্পষ্টতা রয়েছে। যেমন তার সোভিয়েত ইউনিয়নে থাকার সময় এবং কিউবান বিপ্লবীদের সাথে তার যোগাযোগের বিষয়টি। এইসব বিষয়গুলি খোলাসা না হওয়ায় অনেকে ধারণা অসওয়াল্ড একজন ‘পেইনট’ চরিত্র ছিল যার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত করা হয়েছিল।
অন্য আরেকটি থিওরিন দাবী করে পেন্টাগন এবং মার্কিন সেনাবাহিনী জেএফকে হত্যার পেছনে ছিল। প্রেসিডেন্ট কেনেডি তার প্রেসিডেন্সির সময় সেনাবাহিনী এবং পেন্টাগনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিলেন যেটা তাদের অনেকের কাছেই অগ্রহণযোগ্য ছিল। সেনাবাহিনী ভিয়েতনাম যুদ্ধে আরও সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু কেনেডি এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন। এর ফলস্বরূপ অনেকেই বিশ্বাস করেন সেনাবাহিনী এই হত্যাকাণ্ডের সাথে থাকতে পারে।আরেকটি গোষ্ঠীর দাবি জেএফকে হত্যার পেছনে আন্তর্জাতিক অপরাধী সংগঠনও থাকতে পারে। বিভিন্ন সময় ধারণা করা হয়েছে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে হো চি মিন, কিউবান বিপ্লবী, অথবা এমনকি সৌদি আরবের শক্তিশালী গোষ্ঠীও থাকতে পারে।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী কেনেডি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে জড়িয়ে পড়েছিলেন। যার ফলে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন শক্তিশালী গোষ্ঠীর কাছ থেকে বিপদ অনুভূত হয়েছিল।১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর, যখন জেএফকে ডালাসে আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার মাধ্যমে ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে একাধিক কনস্পিরেসি থিওরি প্রচলিত হলেও আজ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কেউ জানে না আসল সত্য কী ছিল। বিভিন্ন থিওরি ও তদন্তের কারণে এই ঘটনার প্রতি মানুষের আগ্রহ আজও অটুট রয়েছে এবং তা ভবিষ্যতেও রহস্যময় এক অধ্যায় হয়ে থাকবে।


