ইবোলা ভাইরাস ১৯৭৬ সালে প্রথম শনাক্ত হয় এবং এর পর থেকে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৪-১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় সবচেয়ে বড় ইবোলা মহামারির সময় হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। এই রোগের মারাত্মক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চমাত্রার জ্বর, রক্তক্ষরণ, অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া এবং দ্রুত মৃত্যুর ঝুঁকি। চিকিৎসক ক্রেগ স্পেনসার এই মহামারির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন এবং নিজেও ইবোলায় আক্রান্ত হন। ভাগ্যক্রমে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন, কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা কীভাবে মহামারিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা (CDC) একসময় মহামারি মোকাবিলায় অগ্রণী ভূমিকা রাখত। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে এসব সংস্থার বাজেট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে তাদের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে USAID-এর স্বাস্থ্য কর্মসূচির তহবিল সংকোচন করা হয়, WHO থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করা হয় এবং CDC-এর কার্যক্রম সীমিত করে ফেলা হয়। এর ফলে অনেক দেশই সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। আগে উন্নয়নশীল দেশগুলো USAID-এর সহযোগিতা পেতে চাইত এবং CDC-এর বিশেষজ্ঞদের সহায়তা গ্রহণ করত। কিন্তু এখন যখন এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে গেছে, তখন কোনো দেশ কেনই বা নতুন রোগের প্রাদুর্ভাবের খবর প্রকাশ করবে? ফলাফল হলো, নতুন মহামারির খবর হয় অনেক দেরিতে জানা যাবে, নয়তো একেবারেই জানা যাবে না।
বিশ্ব এখন এক বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত হয়েছে, যেখানে এক দেশে ছড়িয়ে পড়া সংক্রামক রোগ সহজেই অন্য দেশেও ছড়িয়ে যেতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারি দেখিয়েছে যে, সময়মতো প্রতিক্রিয়া না দিলে কীভাবে একটি সংক্রমণ পুরো বিশ্বকে অচল করে দিতে পারে। তাই ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। প্রথমত উন্নত দেশগুলোর উচিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে নতুন করে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। WHO হলো সেই প্রতিষ্ঠান, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি সহযোগিতা পেলে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করা আরও সহজ হবে। দ্বিতীয়ত USAID-এর মতো সংস্থাগুলোর পুনর্গঠন জরুরি, যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা পুনরায় শক্তিশালী করা যায়। মানবিক সহায়তা প্রদান কেবল দাতব্য কাজ নয়, এটি সংক্রামক রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি কৌশল।
তৃতীয়ত CDC-এর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা পুনঃস্থাপন করতে হবে। কোভিড-১৯-এর পরে অনেকেই স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর প্রতি অবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে, কিন্তু ভবিষ্যতে যখন নতুন সংক্রমণ দেখা দেবে, তখন CDC-এর মতো সংস্থার সহযোগিতা ছাড়া কোনো দেশেরই এককভাবে এই সংকট সামলানো সম্ভব নয়। সংক্রামক রোগের হুমকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ইবোলা, বার্ড ফ্লু, হামের মতো সংক্রমণ যে কোনো সময় আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা, বৈশ্বিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা, এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ করাই ভবিষ্যৎ মহামারি প্রতিরোধের একমাত্র উপায়। নতুবা, আমরা আরও ভয়ংকর স্বাস্থ্য সংকটের সম্মুখীন হব, যা শুধু জীবনহানিই ঘটাবে না, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকেও চরমভাবে প্রভাবিত করবে।


