‘জীবনানন্দ দাশ’ রূপক ও দ্বন্দ্বের  প্রয়োগ : ড. আজফার হোসেন, মার্কিন অধ্যাপক ও চিন্তক

জীবনানন্দ দাশকে আজ আমরা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেই। কিন্তু জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন প্রায় উপেক্ষিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) জীবনানন্দের কবিতাকে প্রথমে একেবারেই গুরুত্ব দেননি, তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল কড়া এবং প্রায় অবজ্ঞাসূচক। পরে তিনি কিছুটা প্রশংসা করলেও, তা ছিল সংক্ষিপ্ত ও কেবল দৃশ্য-রূপকল্পের প্রশংসায় সীমাবদ্ধ। কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) পর্যন্ত জীবনানন্দকে ঠাট্টার ছলে বলেছিলেন “তাঁর কাছে রূপকই মায়ের চেয়ে বড়।”

তবে সত্য এই, জীবনানন্দের কবিতার আসল শক্তি গড়ে উঠেছে তাঁর অসাধারণ রূপক ও চিত্ররূপ নির্মাণের মধ্য দিয়ে। যদিও তিনি এই অলঙ্কারগুলোর বাইরেও অনেক গভীরতায় পৌঁছাতে পেরেছেন। তাঁর সমকালীনদের মধ্যে একমাত্র বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮–১৯৭৪) প্রকৃতভাবে জীবনানন্দকে পাঠ করেছিলেন এবং মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তাঁর এই মূল্যায়নও ছিল পাশ্চাত্য ভাবনাপ্রসূত। তিনি জীবনানন্দকে “সর্বাধিক নিঃসঙ্গ কবি” বলে অভিহিত করলেও, তাঁর লেখাকে শুধুই ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা বা অস্তিত্ববাদী সংকটে সীমাবদ্ধ করেছেন। এই মূল্যায়ন জীবনানন্দের বিশাল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সাহিত্যভাণ্ডারের প্রতি সুবিচার করে না।

জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যজীবন ১৯১৯ থেকে ১৯৫৪ এই ৩৫ বছরে বিস্তৃত। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় ২৬৯টি কবিতা প্রকাশ করেন, যার মধ্যে ১৬২টি কবিতা স্থান পেয়েছে তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত সাতটি কাব্যগ্রন্থে। তবে তাঁর মৃত্যুর পর গত ছয় দশকের বেশি সময়ে আবিষ্কৃত হয়েছে তাঁর ২৮টি উপন্যাস, ১০০-র বেশি গল্প, অসংখ্য প্রবন্ধ, চিঠি, ডায়রি, গান, এমনকি স্কেচ ও আঁকা ছবিও। শুধু তাঁর “সাহিত্য-নোট” ছিল ৪২৭২ পাতার বিশাল সংগ্রহ। তাই আজ আমরা বুঝি, জীবনানন্দ শুধু কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক, গভীর চিন্তকও।

তাঁর উপন্যাসগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন আজও হয়নি। ১৯৩১ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে লেখা এই উপন্যাসগুলো পূর্ণিমা, বিবহা, কারুবাসনা, জীবনপ্রণালী, প্রেতিনীর রূপকথা, মল্ল্যবান, জলপাইহাটি, বাসমতীর উপাখ্যান ও সুতীর্থ সবই পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক কাঠামোয় গড়া। এইসব রচনায় জীবনের অস্তিত্ব, আত্মজৈবনিক সংকট, ভাষার সীমা, সমাজ-রাজনীতি সবই জটিলভাবে জড়িয়ে আছে।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে, জীবনানন্দ দাশ প্রথমত একজন কবি। আজকের পাঠক ও সমালোচকেরা তাঁর কবিতায় খুঁজে পান কিটসের সংবেদনশীলতা, এডগার অ্যালান পো-র রহস্যময়তা ও মৃত্যুচিন্তা, মালার্মের প্রতীকবাদ, ইয়েটসের বিষাদভাব, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের চিত্রময়তা। শার্ল বোদলেয়ারের “সিনেসথেসিয়া”, এক ইন্দ্রিয়ের অনুভব অন্য ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রকাশ জীবনানন্দের কবিতাতেও প্রবলভাবে উপস্থিত। আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এই বিষয়ে মূল্যবান বিশ্লেষণ করেছেন।

এছাড়াও সমালোচকেরা তাঁর লেখায় খুঁজে পেয়েছেন ইমপ্রেশনিজম, অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম, দাদাইজম, সূররিয়ালিজম এমনকি পোস্টমডার্নিজম-এর ছাপ। এ তালিকা পূর্ণ নয়, কিন্তু এটি প্রমাণ করে জীবনানন্দের কাব্যিক ভাষা কতটা বহুমাত্রিক এবং ব্যাখ্যাযোগ্য।

তাঁর কবিতা গ্রামীণ বাংলার দৃশ্যপটে দৃঢ়ভাবে স্থাপিত। বিশেষ করে “রূপসী বাংলা” গ্রন্থে পাওয়া যায় এক অনন্য চিত্রসম্ভার: শব্দহীন আলো, শিশিরে ভেজা চালতা ফুল, সন্ধ্যার ছায়ায় হিম হয়ে আসা শালিক, অশ্বিনের আকাশে কদমবন, ধানগন্ধ মাখা পেঁচা, রোদে ঝলমলে মাছরাঙা, পাকা আম, কামরাঙা, লেবু গাছের ঝোলা ডাল, শারপুঁটি-চিতল মাছের লাফ, কর্ণফুলী, পদ্মা, ধলেশ্বরী, জালাঙ্গী এবং অবশ্যই ধানসিঁড়ি নদী।

এই বাংলাই তাঁর কবিতায় হয়ে ওঠে এক “কংক্রিট ইউনিভার্সাল”। তাই তিনি বলতে পারেন “চলে যেও তুমি, তবে আমি থাকি বাংলার তীরে।”

তবে তাঁর কবিতায় শহরের বাস্তবতাও তীব্রভাবে হাজির। ট্রাম, বাস, গ্যাসবাতি, জানালা, দরজা, দোকানের সাইনবোর্ড, বস্তি, হকার, ভিখারী, দিনমজুর, রিকশাওয়ালা সবই তাঁর কবিতার উপমা ও চিত্রে পরিণত হয়েছে। জীবনানন্দ শহর ও গ্রামের দ্বন্দ্বময় সম্পর্ককে তাঁর কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন এবং উপনিবেশিক বাংলার শ্রেণিবোধসম্পন্ন আধুনিক কবিদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে সচেতন একজন।

আমি পূর্বে যুক্তি দিয়েছি জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় রাজনৈতিক অর্থনীতির ধারণাগুলো ব্যবহার করে পুঁজিবাদের পণ্য সংস্কৃতির সূক্ষ্ম সমালোচনা করেছেন। তাই তাঁকে নিছক নান্দনিক বা জীবনবিমুখ “শুদ্ধতাবাদী” হিসেবে দেখা ভুল।

জীবনানন্দের কবিতার প্রধান ভাব-প্রবণতা অনেক বিস্তৃত, ইতিহাস ও চিরন্তনের দ্বন্দ্ব, ভাষা ও প্রেমের দার্শনিকতা, ভূগোল ও মানচিত্র কল্পনা, যুদ্ধ ও শান্তি, সমাজ-সংঘাত, অতীতচেতনা, মধ্যবিত্ত রাজনীতিবিদদের ভণ্ডামি, নৈতিক পতন, হতাশা ও আশাবাদ, এমনকি বিপ্লবের ধারণা। “বিপ্লব” শব্দটি তিনি সরাসরি ব্যবহার করেছেন বহু কবিতায় যেমন “মহাপৃথিবী”, “সাতটি তারার তিমির”, “বেলা অবেলা কালবেলা” এমনকি তাঁর মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত বহু কবিতাতেও। এইসব কবিতায় রাজনীতি ও দর্শন একত্রে কাজ করে, তাঁর কাব্যিক ভাষা যেন এক সৃষ্টিশীল তড়িৎ শক্তির বিস্ফোরণ। তাঁর সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ সবই তাঁর চেতনা ও কাব্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

সবশেষে জীবনানন্দ দাশ তাঁর “শ্রেষ্ঠ কবিতা”-র ভূমিকায় নিজেই বলেছেন তাঁর লেখাকে যেন লেবেল বা চিহ্ন দিয়ে সীমাবদ্ধ না করা হয়। তিনি চেয়েছেন তাঁর কাজকে সামগ্রিকভাবে দেখা হোক। আর এই “সামগ্রিকতা”-র প্রশ্নটি আজও পাঠক ও সমালোচকদের সামনে এক চ্যালেঞ্জ হয়েই রয়ে গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন