‘… মাঠের কর্মীরা যদি দেখেন, ওপরের সারির নেতাদের প্রায় সবাই নিজেদের জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করে, নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে ফুট সোলজারদের ‘নির্ভয়ে এগিয়ে যাও’ বলে আদেশ দিচ্ছেন, তখন তাঁদের মধ্যে প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি কাজ করে। … শেখ পরিবারের কেউ নেই। আওয়ামী লীগের ওপরের সারির কেউ নেই। মাঝের সারির কেউ নেই। এমনকি তলার সারির সামনের দিকের আধা-সিকি নেতাদেরও কেউ নেই।অথচ দলটি বিরাট ওজনদার এক ঘোষণা দিয়ে বসে আছে। দেশের বাইরে নিরাপদে আছেন, এমন আওয়ামী নেতারা এই ঘোষণার সঙ্গে সংহতি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভার্চুয়াল জগতে বিপুল বিক্রম দেখিয়েছেন। দুনিয়ার যত ভুয়া ভিডিও ক্লিপিং দিয়ে ‘লাখো জনতা ঢাকার দিকে ধেয়ে আসছে’ বলে গুজবের প্রচার চালিয়েছেন।
দিন শেষে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। জিরো পয়েন্টে আওয়ামী লীগের ‘জিরো অবস্থান’ দেখা গেছে। রাজধানীর বাইরের জেলাগুলোতেও আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের মাঠে নামতে বলা হয়েছিল। সেখানেও মাঠ ফাঁকা ছিল। … আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহাসিক ও বড় দল। দলটির লাখ লাখ কর্মী-সমর্থক আছেন। কিন্তু আজকে তাঁরা রাজপথে কেউ নেই। কেন নেই? এর কারণ কি শুধুই বিএনপি-জামায়াতের হাতে মার খাওয়ার ভয়? এর কারণ কি শুধুই পুলিশের হাতে আটক হওয়ার ভয়?
নিশ্চয়ই নয়। কারণ এই ভয় কোনো রাজনৈতিক দলের শতভাগ নিবেদিতপ্রাণ আন্দোলনকর্মীদের রাস্তায় নামা থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে না।পুলিশ গুলি চালাচ্ছে-তারপরও ছাত্র আন্দোলনকারীদের আমরা বুক পেতে সামনে এগিয়ে যেতে দেখেছি। কারণ আন্দোলনকারীরা মোরালি মোটিভেটেড ছিলেন। … আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা লোকজন নিজেরা কোটি কোটি টাকা লুটপাট করে, অর্থ পাচার করে, পুলিশ-বিডিআর ব্যবহার হাজারের বেশি মানুষ হত্যা করে নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নিজেদের দানবিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন।
কর্মীরা স্বার্থের জন্য এই নেতাদের তোয়াজ করতেন ঠিকই, কিন্তু শ্রদ্ধা করতেন না। তাঁরা নেতাদের ডাকে এত দিন রাজপথ দখলে রেখে নানা অপকর্ম করেছিলেন। সেই অপরাধবোধ তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের চেতনাকে নষ্ট করে দিয়েছে। দলের জন্য জীবন বাজী রাখার জন্য দলের যে আদর্শিক অবস্থান থাকা দরকার, তা যখন তারা আর খুঁজে পাননি, তখন তারা মোরালি ডিমোটিভেটেড হয়েছেন। তারা যখন দেখেছেন, দুর্দিনে নেতারা সব পগার পার হয়ে পগারের ওপার থেকে তাদের ‘একত্রিত হয়ে, এক জোট হয়ে’ ঝাঁপিয়ে পড়তে বলছেন, তখন তাঁরা বিরক্ত হয়েছেন।
… দলটিকে অবশ্যই নিজেদের ভুল-ত্রুটি ও অপরাধ স্বীকার করতে হবে। সব ভুলের জন্য, অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। সৎসাহস নিয়ে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এতে দলটির প্রতি মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত হবে। দলটির কর্মীরা অপরাধবোধের গ্লানি থেকে মুক্তি পাবে। জনতার সামনে যাওয়ার সৎসাহস ফিরে পাবে।’


