মার্কসবাদী চিন্তাবিদ থেকে শুরু করে পোপ ফ্রান্সিস এবং ইলন মাস্কের মতো প্রযুক্তি উদ্যোক্তাও এই ধারণার পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা মনে করেন, আগামীদিনে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং অটোমেশনের ফলে যে বিপুল কর্মসংস্থান হ্রাস ঘটবে, তা মোকাবিলা করতে ইউবিআই একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হতে পারে। জার্মানি ১৯৭০-এর দশক থেকে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম নিয়ে আলোচনায় আছে। তবে, বাস্তবে এখন পর্যন্ত তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক যেমন বেকার ভাতা বা সামাজিক সহায়তা – সেগুলো নির্দিষ্ট শর্তের ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃত ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম হবে সম্পূর্ণ শর্তহীন: প্রত্যেককে নির্দিষ্ট একটি মাসিক পরিমাণ অর্থ দেওয়া হবে, চাইলেই তারা চাকরি করতে পারবে বা না-ও করতে পারবে।
কিন্তু মূল প্রশ্ন ছিল: যদি মানুষ মাসে একটি নিশ্চিত অর্থ পায়, তাহলে কি তারা কাজ করা বন্ধ করে দেবে? জীবনযাত্রায় কী ধরনের পরিবর্তন আসবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই জার্মান গবেষকরা একটি বৃহৎ পরীক্ষা পরিচালনা করেন, যার নাম “বেসিক ইনকাম পাইলট প্রজেক্ট”।
কিভাবে পরিচালিত হলো গবেষণা?
“Mein Grundeinkommen” নামে একটি অলাভজনক সংস্থা এবং জার্মান ইকোনমিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (DIW Berlin) সহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এই প্রকল্প শুরু হয়। দুই মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদন করেন, যাদের মধ্য থেকে এলোমেলোভাবে ১২২ জনকে নির্বাচিত করা হয়।
এই ১২২ জনকে প্রতি মাসে তিন বছর ধরে ১২০০ ইউরো করে দেওয়া হয় – একেবারে বিনা শর্তে। একইসঙ্গে, আরও ১৫৮০ জনের একটি নিয়ন্ত্রণ (control) গ্রুপ একই রকম প্রশ্নাবলির উত্তর দিয়েছিল, তবে তারা কোনো অতিরিক্ত অর্থ পায়নি। সব অংশগ্রহণকারীই ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী, একা বসবাসকারী এবং তাদের মাসিক নেট আয় ছিল ১১০০ থেকে ২৬০০ ইউরোর মধ্যে। এইভাবে গবেষকরা একটি তুলনামূলক এবং নিরপেক্ষ ডেটাসেট তৈরি করেন।
ডকুমেন্টারি সিরিজ: “সবার জন্য টাকা”
এই প্রকল্পের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে একটি ডকুমেন্টারি সিরিজ – “Der große Traum: Geld für alle” (বড় স্বপ্ন: সবার জন্য টাকা), পরিচালনায় আলেকজান্ডার ক্লেইডার। পরিচালক বলেন, “আমি কখনোই একটি প্রচারমূলক সিনেমা বানাতে চাইনি, আমি চেয়েছিলাম ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প বলতে। ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম যেন পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মাঝখানে এক নতুন বিকল্প পথের সন্ধান।” ডকুমেন্টারিতে পাঁচজন অংশগ্রহণকারীর জীবনযাত্রা অনুসরণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ থাকেন বার্লিনে, আবার কেউ থাকেন ছোট শহরগুলোতে। একজন উদ্যোক্তা, একজন নার্স, আবার কেউ চাকরি ছেড়ে নতুন পড়াশোনা শুরু করেছেন – তাদের জীবনযাপনের ধরন আলাদা হলেও, সবার জীবনে এই ফ্রি মানির প্রভাব ছিল দারুণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে, সবসময় যে সবাই অর্থ ব্যবহারে সচেতন ছিলেন তা নয়। কেউ কেউ হঠাৎ বাড়তি টাকা পেয়ে অতিরিক্ত ভোগবাদে লিপ্ত হন, যেন কোনো গেম শোর বিজয়ী! মাইকেল বোহমেয়ার, যিনি প্রকল্পের প্রধান উদ্যোক্তা, স্বীকার করেন, “যদি মানুষ শুধু ভোগবিলাস বাড়ায় আর অন্য কিছু না করে, তাহলে আমি হতাশ হব।”
গবেষণার ফলাফল কী বলছে?
তিন বছরের পরীক্ষার শেষে গবেষকরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন:
কাজ চালিয়ে যাওয়া: বেসিক ইনকাম পাওয়া অংশগ্রহণকারীরা গড়ে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজ চালিয়ে গেছেন। অর্থাৎ, ‘ফ্রি মানি পেলে সবাই অলস হয়ে পড়বে’ – এই আশঙ্কা ভিত্তিহীন।
চাকরি পরিবর্তন: এই গ্রুপে চাকরি পরিবর্তনের হার কন্ট্রোল গ্রুপের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পেয়ে তারা ঝুঁকি নিতে সাহসী হয়েছেন।
পড়াশোনায় অগ্রগতি: অনেকে নতুন কোনো কোর্সে ভর্তি হয়েছেন বা বিদ্যমান চাকরির পাশাপাশি স্কিল ডেভেলপমেন্টে মনোযোগ দিয়েছেন।
মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনের সন্তুষ্টি: যারা বেসিক ইনকাম পেয়েছেন, তারা তাদের জীবনের প্রতি আরও বেশি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মনোবিজ্ঞানী সুজান ফিডলার বলেন, “বেসিক ইনকাম শুধু আর্থিক নিরাপত্তা নয়, এটি আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: বাস্তব জীবনে পুরো দেশে কীভাবে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম চালু করা যাবে?
Mein Grundeinkommen সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, ধনী ১০% নাগরিকদের অতিরিক্ত করের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে পুরো জনগণকে এই সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। তাদের মতে, এর ফলে ৮৩% জনগণ আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, আর ৭% মধ্যবিত্তের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। তাদের বিশ্বাস, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং গণতন্ত্র শক্তিশালী করার জন্য বেসিক ইনকাম অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে। ক্লারা সিমন, Mein Grundeinkommen-এর বর্তমান প্রধান, বলেন: “আমরা প্রমাণ করেছি, বেসিক ইনকাম মানুষকে অলস করে না। বরং এটা সামাজিক উন্নয়নের জন্য এক বিশাল সুযোগ। যারা এই ফলাফল জানার পরও কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না, তারা সমগ্র সমাজের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন।”
শেষ কথা
জার্মানির এই পরীক্ষামূলক প্রয়াস দেখিয়েছে, মানুষ যদি আর্থিক নিরাপত্তা পায়, তবে তারা শুধু জীবিকার জন্য কাজ করেন না, বরং নিজের জীবনকে আরও অর্থবহ করে গড়ে তুলতে চান। এই গবেষণা প্রমাণ করে, বেসিক ইনকাম কোনো বিলাসিতা নয় – এটি হতে পারে ভবিষ্যতের ন্যায্য, সমান এবং উন্নত সমাজের এক শক্ত ভিত্তি।


