জলবায়ু সম্মেলনের আগে ব্রাজিলের বিতর্কিত তেল ও মহাসড়ক প্রকল্প

ব্রাজিল সরকার সম্প্রতি অ্যামাজন অঞ্চলে একাধিক বিতর্কিত তেল অনুসন্ধান ও অবকাঠামো প্রকল্পে দ্রুত অনুমোদন দিয়েছে, যা পরিবেশবাদী মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই সিদ্ধান্তগুলো এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ব্রাজিল নিজেই ২০২৫ সালের শেষদিকে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন (COP-30) আয়োজন করতে যাচ্ছে এবং সেই সম্মেলনের মূল প্রতীকী কেন্দ্রবিন্দুই হচ্ছে অ্যামাজন।

অ্যামাজন পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য অঞ্চল এবং একটি প্রধান “কার্বন সিঙ্ক”, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রশমনে মুখ্য ভূমিকা রাখে। কিন্তু ব্রাজিল সরকারের নতুন নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি এই সংবেদনশীল অঞ্চলে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং মহাসড়ক সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে এই প্রকল্পগুলো অপরিহার্য। বিশেষত উত্তর ব্রাজিলের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর জন্য। তবে এই উন্নয়নের মূল্য যে পরিবেশকে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

নতুন অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অ্যামাজনের উত্তরাঞ্চলে তেল অনুসন্ধানের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান এবং BR-319 মহাসড়ক সংস্কার প্রকল্প। বিশেষজ্ঞদের মতে এই মহাসড়কটি পুনর্গঠন করা হলে, অ্যামাজনের গভীরতর অঞ্চলে প্রবেশ সহজ হবে এবং এতে অবৈধ বন উজাড়, আদিবাসীদের ভূমিতে অনুপ্রবেশ এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে যাবে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবেশবিদেরা এই পদক্ষেপকে জলবায়ু সংকটের মুখে বিপজ্জনক বার্তা হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষায় যখন বিশ্ব নেতারা অ্যামাজনের সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনায় বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন আয়োজক দেশ নিজেই যদি তা ধ্বংসের পথে এগোয়, তা হলে বিশ্ববাসীর আস্থা কীভাবে স্থাপন করা সম্ভব?

বিশেষ করে ব্রাজিলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল অ্যামাজনের রক্ষা। তাঁর প্রশাসনের এ ধরনের সিদ্ধান্ত তাই রাজনৈতিকভাবে দ্বৈতনীতির উদাহরণ হিসেবেও আলোচিত হচ্ছে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে একটি ‘সুষম সমঝোতা’ খুঁজে পাওয়াই তাদের লক্ষ্য। তারা আশ্বস্ত করছে যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যথাযথ পরিবেশগত মূল্যায়ন ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরামর্শ গ্রহণ করা হবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, অতীতে এমন অনেক প্রকল্পে পরিবেশগত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে, এবং আদিবাসীদের কণ্ঠ বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। তাই এই আশ্বাস অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।

সার্বিকভাবে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনের আগেই এই প্রকল্পগুলো অনুমোদন ব্রাজিলের নৈতিক অবস্থান ও জলবায়ু নেতৃত্বের প্রশ্নে গভীর সন্দেহ তৈরি করছে। এই অবস্থায় বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে অ্যামাজন কি উন্নয়নের নামে ধ্বংস হবে, না কি এটি হবে টেকসই নীতির নতুন প্রতীক?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন