বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ধনী দেশগুলোর উদাসীনতা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর নেতৃত্বে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো সতর্ক করে দিয়েছে, ধনী দেশগুলোর এই ধীরগতির পদক্ষেপ তাদের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলছে। প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী, সকল দেশেরই ২০২৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর নতুন পরিকল্পনা (NDC) জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও এ বছরের ফেব্রুয়ারি ছিল নির্ধারিত সময়সীমা, অধিকাংশ দেশ তা মিস করেছে। জাতিসংঘ এখন সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিকল্পনাগুলো জমা দিতে বলছে এবং বলছে সময় নিয়ে বিস্তারিত নীতিমালা যুক্ত করে জমা দেওয়াই উত্তম।
তবে এখন পর্যন্ত কেবল কয়েকটি দেশ তাদের পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। যারা দিয়েছে তাদের অনেকের পরিকল্পনাই বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসূচির তুলনায় অপ্রতুল। এর ফলে বর্তমান ধারায় বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রায় ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো বলছে, তাদের অস্তিত্ব সরাসরি এই জলবায়ু সংকটের ওপর নির্ভর করছে। এক চিঠিতে তারা উন্নত দেশগুলোর কাছে প্রশ্ন তুলেছে: “আমরা বারবার আমাদের বাস্তবতা আপনাদের সামনে এনেছি। এখন প্রশ্ন হলো, এই জ্ঞানের সঙ্গে আপনারা কী করবেন?”
চিঠিতে তারা জোর দিয়ে বলেছে, এই বছর কপ৩০ সম্মেলনের আগেই উন্নত দেশগুলোকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে বিস্তৃত NDC জমা দিতে হবে। শুধু কার্বন অফসেটের উপর নির্ভর না করে, ঘরোয়া কার্বন নির্গমন কমানোর উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তারা আরো বলেছে, যদি জমা দেওয়া পরিকল্পনাগুলো যথেষ্ট না হয়, তাহলে কপ৩০-এ সেগুলো সংশোধনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। একইসঙ্গে, জীবাশ্ম জ্বালানি ধীরে ধীরে পরিত্যাগের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও এসব NDC-তে থাকতে হবে। অন্যদিকে জলবায়ু তহবিলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও ধনী দেশগুলো ব্যর্থ হচ্ছে। প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য বছরে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার জলবায়ু তহবিল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি ছিল। এখনও সেই প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা নেই। দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর মতে, ধনী দেশগুলো সহায়তার খরচ দেখে পিছু হটতে পারে। কিন্তু তারা সতর্ক করে দিয়েছে: “দেরি বা নিষ্ক্রিয়তার খরচ আরও অনেক বেশি। আমরা ইতিমধ্যেই প্রকৃতির ধ্বংস, খাদ্য ব্যবস্থার বিপর্যয়, অর্থনৈতিক ধস এবং গণ-অভিবাসনের ঝুঁকির মুখোমুখি।” মানবতা, দূরদর্শিতা এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতাই এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ।
এদিকে যুক্তরাজ্যের জ্বালানি মন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বলেন, শক্তিশালী জলবায়ু নীতিমালা ছাড়া কোনো জাতীয় নিরাপত্তা সম্ভব নয়। যুক্তরাজ্য হলো অল্প কয়েকটি উন্নত দেশের একটি, যারা ইতোমধ্যে তাদের নতুন NDC জাতিসংঘে জমা দিয়েছে। সিভিল সোসাইটি গ্রুপগুলোর দাবি, ভবিষ্যতের লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফাঁকা প্রতিশ্রুতি না দিয়ে, বিস্তারিত নীতিমালা ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে NDC জমা দিতে হবে। বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে এই বছরের জলবায়ু সম্মেলনে গৃহীত পদক্ষেপের ওপর। প্রশ্ন হলো, ধনী বিশ্ব কি নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে, নাকি পুরো মানবজাতিকে একটি অনিবার্য বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে?


