সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে উচ্চ আকাশের বায়ুপ্রবাহ (jet stream) দ্রুত পরিবর্তনশীল হয়ে উঠছে, যা বিমান চলাচলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝাঁকুনির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে। যাত্রীবাহী বিমানভ্রমণ ভবিষ্যতে আগের তুলনায় আরও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে
CAT এমন এক ধরনের ঝাঁকুনি, যা কোনো মেঘ, বজ্রপাত বা ঝড়-ঝঞ্ঝার উপস্থিতি ছাড়াই পরিষ্কার আকাশে আকস্মিকভাবে ঘটে। সাধারণত ৯–১২ কিলোমিটার উচ্চতায় এটি বেশি দেখা যায়। যেহেতু রাডারে ধরা পড়ে না, তাই পাইলটরা আগাম সতর্ক হতে পারেন না, ফলে এটি বিমানের ভিতরে যাত্রী ও ক্রুদের জন্য হঠাৎ বিপদ সৃষ্টি করে।
যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল উইলিয়ামস ও তার দল ৪০ বছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখেছেন ১৯৭৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে মাঝারি মাত্রার CAT ঘটনা ৫৫% এবং তীব্র CAT ১৭০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
উইলিয়ামস বলেন, “২০৫০ সালের মধ্যে এই প্রবণতা দ্বিগুণ হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র–ইউরোপ রুট এবং উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের পথগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হবে।”
এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার (ভারত-বাংলাদেশ) আকাশপথও সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। ২০২৪ সালে ICAO প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কলকাতা ও ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত রুটে CAT ঘটনায় ১২% বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বায়ু ও তাপমাত্রার বৈচিত্র্য এই প্রবণতা আরও বাড়াতে পারে।
কেন বাড়ছে ঝাঁকুনি?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে সমুদ্রপৃষ্ঠ ও আকাশের তাপমাত্রার ব্যবধান বাড়ছে। এতে jet stream–এর গতিবিধি বেশি ওঠানামা করছে। ফলে বায়ুপ্রবাহের বিভিন্ন স্তরে গতি ও দিক হঠাৎ বদলাচ্ছে (wind shear)। এই অস্থিতিশীলতা সরাসরি CAT-এর জন্ম দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিদ অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান বলেন, “উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণাঞ্চলে ২০২৩ সালে উচ্চমাত্রার বায়ুপ্রবাহে তাপমাত্রা বৈষম্য বাড়ায় বাংলাদেশের আকাশেও CAT–এর নজির দেখা গেছে।”
CAT শুধু অস্বস্তি নয়, নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ। IATA-এর তথ্য মতে, বিশ্বে বিমানের ৭২% যাত্রী–আহত ঘটনা CAT–এর কারণে ঘটে। ২০২৩ সালে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে ঢাকামুখী রুটে ৪ জন যাত্রী গুরুতর আহত হন এমন ঝাঁকুনিতে।
এয়ারলাইন্সগুলো এখন উন্নত পূর্বাভাস প্রযুক্তি (AI-ভিত্তিক Turbulence Prediction), স্যাটেলাইট ডেটা ও স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং ব্যবহারে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। তবু, দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে বিজ্ঞানীরা বলছেন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলোকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
আকাশপথের এই অদৃশ্য ঝুঁকি আমাদের মনে করিয়ে দেয় জলবায়ু সংকট শুধু মাটি আর সাগরের নয়, আকাশের উপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। দক্ষিণ এশিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে যেখানে বিমানচলাচল বাড়ছে, সেখানে CAT–এর বাড়তি ঝুঁকি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন ভবিষ্যতের নিরাপদ উড্ডয়নের জন্য যাত্রী, পাইলট ও নীতিনির্ধারকদের এখন থেকেই তথ্য-ভিত্তিক সচেতনতা ও প্রস্তুতি জরুরি।


