বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বাস্তবতার মুখোমুখি, তখন প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠছে শিল্প। শুধু তথ্য বা প্রতিবাদ নয়, অনুভূতি, স্মৃতি এবং সংবেদনশীলতাকে কেন্দ্রে রেখে আজকের পৃথিবীতে জন্ম নিচ্ছে নানা শিল্প-আন্দোলন। তেমনি একটি অভিনব ও আবেগনির্ভর আন্দোলনের নাম “The Herds Project”। এটি একটি চলমান ভাস্কর্য-ভিত্তিক আর্ট প্রকল্প, যেখানে বিশালাকৃতির প্রাণীর পাপেটগুলো পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভ্রমণ করে জলবায়ু সংকটের গভীরতা ও মানবিক বিপর্যয়ের বার্তা বহন করছে।
“The Herds Project” মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব মানুষ ও প্রাণী বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বিশাল পাপেট প্রাণীগুলোকে রূপ দিয়েছে। এই প্রকল্পে যেমন দেখা যায় বিশাল গরু, হাতি, কিংবা বিলুপ্তপ্রায় বন্য প্রাণীদের আদলে তৈরি মূর্ত, তেমনি এগুলোর ভেতর দিয়ে উঠে আসে বাস্তুচ্যুতির দুঃখ, নিঃসঙ্গতা ও ক্ষয়িষ্ণু প্রাকৃতিক পরিবেশের আর্তনাদ। এই পাপেটগুলো সাধারণত একেকটি নাট্যদলের সহায়তায় হ্যান্ডেল করা হয়। একটি প্রাণীকে সচল রাখতে প্রায় ৮-১০ জন মানুষ প্রয়োজন হয়, যারা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি ও অভিব্যক্তি পরিচালনা করেন। ফলে এই প্রাণীগুলো নিছক দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য নয়, জীবন্ত অনুভবের বাহক।
এই প্রকল্পের লক্ষ্য ২০,০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আফ্রিকা থেকে আর্কটিক পর্যন্ত এক বিশাল ভৌগোলিক ও প্রতীকী যাত্রা সম্পন্ন করা। যাত্রাপথে এই প্রাণীরা শহর, গ্রাম, পাহাড়, মরুভূমি, নদী পার হয়ে চলেছে। প্রতিটি স্থানই যেন একটি পর্ব, যেখানে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে এই পাপেটগুলো একাত্ম হয়ে পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে সংলাপ গড়ে তুলছে। যেখানেই এরা যাচ্ছে, সেখানেই স্থানীয় শিশু, পরিবার ও শিল্পীদের সঙ্গে একটি ছোটখাটো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কেউ গান গায়, কেউ কবিতা পড়ে, কেউবা নাটক করে। এভাবে একেকটি স্টপেজে সৃষ্টি হচ্ছে সাময়িক কিন্তু প্রভাবশালী মঞ্চ, যেখানে মানুষ শুনছে মাটির কান্না, বাতাসের হাহাকার এবং প্রাণীর প্রতিধ্বনি।
প্রকল্পের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো “জলবায়ু উদ্বাস্তু” বিষয়টি। বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৪ কোটিরও বেশি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নিজ ভূমি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। কেউ খরা, কেউ বন্যা, কেউ ঝড়ের কারণে নিজ ঘর হারিয়েছে। এই বাস্তবতা এখনও বহু উন্নত দেশের মানুষের কাছে শুধু পরিসংখ্যানমাত্র। কিন্তু যখন এক বিশাল হাতি বা গরু হেঁটে শহরের রাস্তায় প্রবেশ করে, তখন সেটি শুধু কৌতূহলের জন্ম দেয় না, বরং প্রশ্ন তোলে কেন এই বুনো প্রাণী লোকালয়ে? এভাবে তারা মানুষের মনোযোগ ধরার চেষ্টা করছে। এই শিল্প তাই তথাকথিত প্রতিবাদী ভাষার বাইরে গিয়ে এক নতুন প্রতিবাদ নির্মাণ করে, যা নীরব অথচ গভীর। একটি শিশু যখন পাপেট প্রাণীটির চোখে চোখ রাখে, তখন সে দেখে নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের গ্রহের অস্তিত্বের সঙ্কট।
“The Herds Project”-এ ব্যবহৃত অনেক প্রাণী এমন প্রজাতির প্রতিরূপ, যারা বিলুপ্তপ্রায় বা ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে। এতে করে শুধু মানুষের দুর্দশা নয়, বরং সমগ্র প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ভাঙনের গল্প বলা হয়। এই প্রকল্প প্রমাণ করে দেয় শিল্প শুধু গ্যালারি বা মঞ্চে আবদ্ধ নয়। এটি রাস্তায় নেমে আসতে পারে, পদচারণায় রূপ নিতে পারে এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে এক বৈশ্বিক বার্তা দিতে পারে। এটি শিল্পের সেই রূপ, যা আন্দোলন, অধ্যাত্ম ও মানবিকতার এক যোগসূত্র হয়ে ওঠে। “The Herds Project”-এর এই ভ্রমণ তাই শুধুই এক প্রতীকী অভিযান নয়, বরং এটি এক ধরণের ধ্যানী পথচলা, যাকে আমরা বলতে পারি “slow protest”। এটি ধ্বংসের বার্তা দেয় না, বরং সংলাপের মাধ্যমে সম্ভাবনার দরজা খোলে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হলে দরকার অনুভব, দরকার গল্প, দরকার মানবিক স্পর্শ। “The Herds Project” সেই স্পর্শ এনে দিচ্ছে শিল্পের হাত ধরে।


