দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে–সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রের বিমান বিশেষজ্ঞ ও পাইলটরা ঢাকা শহরের মত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন–ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ প্রকৃতির কারণে রাজধানীর আকাশে সামরিক প্রশিক্ষণ বিমান উড়ানো দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে বিমান বাহিনী সাধারণত তাদের ফাইটার জেট প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে।
নিহত পাইলটের একই ব্যাচের বিমান বাহিনীর একজন পাইলট নাম প্রকাশ না করে বলেন–এ ধরনের জনবহুল এলাকায় প্রশিক্ষণ চালানো সামরিক জেট পাইলটদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
“যদিও পুরো প্রশিক্ষণ এলাকাটি এক বা দুইতলার বেশি উঁচু ভবনবিহীন থাকার কথা, বাস্তবে ফ্লাইট পথজুড়ে অনেক উচ্চ ভবন রয়েছে। ফলে, আমাদের খুব দ্রুত উচ্চতা নিতে হয় এবং উঁচু উচ্চতায় থাকতে হয়,” বলেন ওই পাইলট।
একই ধরনের প্রশিক্ষণ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক সাবেক পাইলটও এতে সম্মত হন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, পাইলট হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি ‘গ্লাইড পাথ’-এর চেয়ে বেশি উচ্চতায় আছেন এবং এর ফলে রানওয়ে মিস করে ফেলতে পারেন। এজন্য তিনি উচ্চতা কমাতে ইঞ্জিনের শক্তি কমিয়েছিলেন।
‘গ্লাইড পাথ’ হচ্ছে একটি বিমান যখন অবতরণের প্রস্তুতি নেয়, তখন সেটি যে উল্লম্ব পথে রানওয়ের দিকে এগোয়, সেটি।
“এরপর হয়তো তাকে পুনরায় গতি বাড়াতে ইঞ্জিনে শক্তি দিতে হয়। কিন্তু জেট ইঞ্জিনের একটি সীমাবদ্ধতা আছে—পাওয়ার স্পুল আপ হতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে,” বলেন প্রবীণ পাইলট। এই কয়েক সেকেন্ডই গুরুত্বপূর্ণ, যখন অবতরণ পয়েন্ট মাত্র কয়েক সেকেন্ড দূরে।
গতকাল উত্তরার স্কুল চত্বরে বিধ্বস্ত FT-7 BGI ধরনের ফাইটার জেট শব্দের চেয়েও দ্রুতগামী (সুপারসনিক) গতিতে উড়ে—যার গতি পরিমাপ হয় “ম্যাখ” এককে, যা শব্দের গতির (১,২৩৪ কিমি/ঘণ্টা) সমতুল্য। যাত্রীবাহী বিমানের তুলনায় এ ধরনের বিমান অনেক বেশি গতিতে ওড়ে এবং অবতরণ করে। সংশ্লিষ্ট বিমানটি ম্যাখ ২ পর্যন্ত গতি তুলতে পারে, অর্থাৎ ঘণ্টায় ২,৪০০ কিমি-রও বেশি।
বিশেষজ্ঞ এবং পাইলটরা বলেন–সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম সাগর দুর্ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ৩.৩ কিলোমিটার দূরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অবতরণ করতে পারতেন।
সামরিক ও বেসামরিক বিমান চলাচলের পেশাজীবীরা প্রশ্ন তুলেছেন, বিমান বাহিনীর হাতে যশোর বা চট্টগ্রামের মতো ঘনবসতিহীন ঘাঁটি থাকার পরেও কেন ঢাকার মতো জনবহুল এলাকায় এ ধরনের প্রশিক্ষণ চালানো হচ্ছে?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পেশাজীবী বলেন, বিশ্বের খুব কম দেশই আছে যেখানে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান একই রানওয়ে ব্যবহার করে যেটি বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হয়।
তবে তিনি স্বীকার করেন–যেসব দেশে জমির স্বল্পতা, ঐতিহাসিক সামরিক ঘাঁটি কিংবা কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে, সেখানে সামরিক ও বেসামরিক উভয়েই একই বিমানবন্দর ব্যবহার করতে দেখা যায়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ৩২ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক সিনিয়র পাইলট বলেন, “আমি শত শত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়েছি, কিন্তু কোথাও বিমানবাহিনীর ফ্লাইটের কারণে বিলম্বের সম্মুখীন হইনি। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সম্ভবত একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যেখানে ফাইটার জেট উড়ানো হয়।”
তিনি বিমানবন্দরের চারপাশের অপরিকল্পিত নগরায়ণকেও দোষারোপ করেন।
“অধিকাংশ বিমান দুর্ঘটনা ঘটে উড্ডয়ন ও অবতরণের সময়। তাই কঠোরভাবে নির্ধারণ করা হয় যে, বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোচ পথের কাছাকাছি জনবহুল স্থাপনা যেমন স্কুল, কলেজ, শপিং মল ইত্যাদি নির্মাণ নিষিদ্ধ। কিন্তু এখানে এটাই ঘটছে,” বলেন তিনি, এবং এই ট্র্যাজেডির জন্য অপরিকল্পিত নগরায়ণকে দায়ী করেন।
(দ্য ডেইলি স্টার থেকে সংক্ষেপিত)


