বিশ্বের সামরিক ইতিহাস, রাজনীতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের কৌশল নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার প্রতিটিতেই একটি নাম অনিবার্যভাবে উচ্চারিত হয়—সুন তজু (Sun Tzu)। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে কিংবা মতান্তরে পঞ্চম শতকে চীন যখন বহু খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত এবং পরস্পরের মধ্যে নিরন্তর যুদ্ধে লিপ্ত, তখন এই মহাকৌশলী রচনা করেন তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য আর্ট অফ ওয়ার’। এটি কেবল যুদ্ধের নির্দেশিকা নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনা, কূটনীতি ও ষড়যন্ত্রের এক গভীর দার্শনিক বিশ্লেষণ।
সুন তজুর জীবনকাল এবং তাঁর গ্রন্থ রচনার সময়কাল ছিল প্রাচীন চীনের ইতিহাসে এক উত্তাল অধ্যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮১ থেকে ২২১ অব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত ‘যুদ্ধরত রাজ্যসমূহের যুগ’ ছিল ক্ষমতার চরম সংঘাতের সময়। এই সময়ে, ছোট ছোট রাজ্যগুলি একে অপরের সঙ্গে জীবন-মরণ যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, যেখানে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বই ছিল টিকে থাকার একমাত্র মাপকাঠি।
এই যুগেই সামরিক চিন্তাধারার বিকাশ সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। এই পরিবেশই সুন তজুকে তাঁর বিখ্যাত তত্ত্বটি উদ্ভাবনে প্রভাবিত করে, যুদ্ধ হলো ছলনার পথ। সে সময়ে সামরিক কৌশলের লক্ষ্য কেবল ভূমি দখল বা শত্রুকে পরাজিত করা ছিল না, কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং মানসিক দুর্বলতার মাধ্যমে শত্রুকে যুদ্ধ না করেই আত্মসমর্পণ করাতে পারাকেই শ্রেষ্ঠ সামরিক বিজয় মনে করা হতো। নিরন্তর সংঘাত ও অনিশ্চয়তার এই সময়েই জন্ম নিয়েছিল এমন এক দর্শন, যা রক্তপাতকে সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে এনে সর্বোচ্চ ফল লাভের পথ দেখায়।
সুন তজুর তত্ত্বের সবচেয়ে বিপ্লবী দিকটি হলো তাঁর যুদ্ধবিরোধী মূলনীতি। ‘দ্য আর্ট অফ ওয়ার’-এর মূলমন্ত্র হলো— শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা সেই, যে যুদ্ধ না করে শত্রুকে পরাজিত করতে পারে।
“সেরা নীতি হলো শত্রুর পরিকল্পনা ভেঙে দেওয়া; তার পরের সেরা নীতি হলো শত্রুর জোট ভেঙে দেওয়া; তার পরের সেরা নীতি হলো শত্রুর সৈন্যবাহিনীকে মাঠে নামানোর আগেই পরাজিত করা; এবং সবচেয়ে খারাপ নীতি হলো দুর্গ অবরোধ করা।”
এই উদ্ধৃতিটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে তিনি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের অধীনে স্থান দিয়েছিলেন। তাঁর কৌশলটি ছিল প্রধানত মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক। একজন শাসক বা সেনাপতিকে যুদ্ধ শুরু করার আগেই শত্রুর দুর্বলতা, মিত্রদের সম্পর্ক এবং তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিশ্লেষণ করতে হবে। শত্রুর পরিকল্পনাকে তার অগোচরেই ব্যর্থ করে দেওয়া হলো সবচেয়ে সূক্ষ্ম সামরিক শিল্প। সুন তজুর কাছে যুদ্ধ ছিল চূড়ান্ত আশ্রয়, যখন অন্যান্য সব রাজনৈতিক কৌশল ব্যর্থ হয়।
সুন তজু সামরিক শক্তিকে রাজনীতির একটি সরঞ্জাম হিসেবে বিবেচনা করতেন, লক্ষ্য হিসেবে নয়। তাঁর গ্রন্থে বারবার যে মূল বিষয়গুলি উঠে এসেছে, তাতে কৌশল এবং রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সুন তজু মনে করতেন, গোয়েন্দাগিরি হলো যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তিনি পাঁচ ধরনের গুপ্তচরের কথা বলেছেন, যার মধ্যে স্থানীয় গুপ্তচর, অভ্যন্তরীণ গুপ্তচর এবং ‘বিনষ্টকারী গুপ্তচর’ বা ‘ষড়যন্ত্রকারী গুপ্তচর’ অন্তর্ভুক্ত। এই শেষোক্ত গোয়েন্দারা শত্রুকে ভুল তথ্য দিয়ে ধরা পড়তো বা নিহত হতো, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শত্রুর মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। এই ধরনের সুসংগঠিত ষড়যন্ত্র সামরিক অভিযানের আগে শত্রুর রাজনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিত। এই কৌশল স্পষ্ট করে যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে গোপন আলোচনা কক্ষ ও শত্রুর দরবারই ছিল তাঁর কাছে বিজয়ের মূল চাবিকাঠি।
সুন তজুর মতে, সৈন্যরা তখনই সাহস ও শৃঙ্খলার সাথে যুদ্ধ করে যখন তারা জানে যে তাদের শাসক সঠিক পথের পথিক। সামরিক বিজয়ের ভিত্তি হলো ন্যায়, সুশাসন এবং জনগণের সমর্থন। এর মাধ্যমে তিনি সামরিক শক্তিকে রাজনৈতিক বৈধতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। একজন নৈতিকভাবে শক্তিশালী শাসক সহজেই তার সেনাবাহিনীকে অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই নীতি দেখায়, যুদ্ধ জেতার জন্য কেবল সামরিক সরঞ্জামই যথেষ্ট নয়, বরং জনগণের আস্থা ও নৈতিক সমর্থন অপরিহার্য।
সুন তজু যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবেশ এবং সময়ের গুরুত্বকে সর্বোচ্চ স্থান দেন। তিনি বলেন, সেনাপতিকে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে জানতে হবে। ঠিক যেমন রাজনীতিতে সফল হতে হলে একজন শাসককে জনগণের মেজাজ, মিত্রশক্তির অবস্থান এবং বৈশ্বিক পরিবর্তন অনুধাবন করে নীতি পরিবর্তন করতে হয়, ঠিক তেমনই যুদ্ধক্ষেত্রেও পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল বদলাতে হবে। তিনি জোর দিয়েছিলেন ‘অনিয়মিত কৌশল’-এর ওপর, যেখানে শত্রুর প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে কাজ করা হয়। এটি আধুনিক রাজনীতির ‘আশ্চর্যজনক পদক্ষেপ’ বা ‘সারপ্রাইজ মুভ’-এর মতোই কাজ করে।
সুন তজুর এই গ্রন্থটি সামরিক কৌশল ছাপিয়ে আধুনিক রাজনীতি, কূটনীতি এবং এমনকি কর্পোরেট ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।
চীন, জাপান, কোরিয়া এবং ভিয়েতনামের সামরিক শিক্ষায় এই গ্রন্থটি ছিল মৌলিক পাঠ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি কৌশল এবং ভিয়েতনামের গেরিলা যুদ্ধে এই তত্ত্বের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। তাঁর ‘ছলনাভিত্তিক যুদ্ধ’ নীতিটি দুর্বল পক্ষের জন্য শক্তিশালী শত্রুকে মোকাবিলার পথ খুলে দিয়েছিল।
আধুনিক ব্যবসায়িক পরিবেশকেও এক প্রকার ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ হিসেবে দেখা হয়। এখানে প্রতিযোগিতা, বাজার দখল, এবং অর্থনৈতিক ষড়যন্ত্রে সুন তজুর নীতিগুলি যেমন: শত্রুর দুর্বলতা চিহ্নিত করা, সম্পদ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা, এবং চমকপ্রদ আক্রমণের ব্যবহার ব্যবহৃত হয়। বাজারে প্রতিপক্ষের কৌশল অনুমান করা এবং নিজেদের দুর্বলতা গোপন রাখা এই দর্শন থেকেই এসেছে।
কূটনীতিতে আলোচনা ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে শত্রুপক্ষকে নতি স্বীকার করানো, তাদের জোট ভাঙা এগুলি সরাসরি সুন তজুর কৌশল থেকে নেওয়া হয়েছে। একজন সফল কূটনীতিক যুদ্ধ না করেও কেবল কৌশলগত অবস্থানে গিয়ে চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করতে পারেন, যা ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
সুন তজু আমাদের দেখিয়েছেন চূড়ান্ত বিজয় আসে শারীরিক শক্তি প্রয়োগের আগে মানসিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। তাঁর কৌশল ছিল ‘যুদ্ধের শিল্প’, যা ছিল মূলত ‘যুদ্ধ এড়ানোর শিল্প’।


