মার্কিন চীন বাণিজ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ঘোষণা দিয়েছেন — তিনি আগামী মাসের নির্বাচনে জয়ী হলে ‘বিরল মৃত্তিকা খনিজ'(rare earth materials/elements)-এর মজুদ গড়তে ১.২ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার বিনিয়োগ করবেন। এ ঘোষণা এসেছে এমন সময়ে, যখন চীন সাতটি বিরল খনিজ উপাদানের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এসব উপাদান বৈদ্যুতিক গাড়ি, যুদ্ধবিমান ও রোবট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। চীনের এই নিষেধাজ্ঞা সব দেশের উপরই প্রযোজ্য হলেও এটি মূলতঃ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিরল মৃত্তিকা হলো ১৭টি মৌলের একটি গোষ্ঠী — “বিরল” বলা হয় না, কারণ এগুলো উত্তোলন এবং পরিশোধন করা অত্যন্ত কঠিন। চীন এবং অস্ট্রেলিয়া উভয়েরই বিরল মৃত্তিকার রিজার্ভ রয়েছে। কিন্তু ৯০% বিরল খনিজ পরিশোধন চীনে ঘটে, যা এগুলোকে প্রযুক্তিতে ব্যবহারযোগ্য করে। ফলে দেশটি সরবরাহের উপর বড় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। এবং সেটাই পশ্চিমা দেশগুলোকে আতঙ্কিত করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরল মৃত্তিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যখন বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন বেড়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুসারে, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৭৫% বিরল খনিজ আমদানি চীন থেকে এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত আয়রন অর রিসার্চের পরিচালক ফিলিপ কিরক্লেচনার বিবিসিকে বলেন — গত কয়েক দশকে চীন যখন দ্রুত পরিশোধন প্রক্রিয়ায় আধিপত্য স্থাপন করেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি যোগ করেন, “চীন এখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার লাইফলাইন নিয়ন্ত্রণ করছে।” টেসলার সিইও এলন মাস্ক এই সপ্তাহে বলেছেন, উন্নত ম্যাগনেটে ব্যবহৃত বিরল মৃত্তিকা রপ্তানি বন্ধ হওয়ার ফলে মানবাকৃতির রোবট তৈরিতে টেসলার সক্ষমতা প্রভাবিত হয়েছে — যা দেখাচ্ছে, মার্কিন কোম্পানিগুলোর উপর চীনের প্রভাব কতটা বড় হতে পারে। আলবানিজের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, এই খনিজ মজুদ দেশীয় ও মিত্র দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঁচামাল থাকলেও পরিশোধন এখনো চীনের হাতে, তাই শুধু খনিজ মজুদ করে সমাধান আসবে না।
লিথিয়াম — যদিও বিরল খনিজ নয়, তবে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এবং সৌর প্যানেল তৈরির জন্য অপরিহার্য একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ খনিজ’ (critical minerals) — এর একটি উদাহরণ। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের ৩৩% লিথিয়াম উত্তোলন করে, কিন্তু এর মাত্র সামান্য অংশ পরিশোধন ও রপ্তানি করে। বিপরীতে, চীন মাত্র ২৩% লিথিয়াম উত্তোলন করলেও, ৫৭% পরিশোধন করে (আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী)। অস্ট্রেলিয়া বিরল খনিজ পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মতে — ২০২৬ সালের আগে পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া চীনের উপর নির্ভর করতেই বাধ্য থাকবে।
নেটিক্সিসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ আলিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বিবিসিকে বলেছেন — যদি চীন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে অস্ট্রেলিয়া তার খনিজ রিজার্ভ বিক্রি শুরু করে বিশ্ববাজারে দাম কমাতে সাহায্য করতে পারে, এবং চীনের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা কমাতে পারে।তবে তিনি সতর্ক করেছেন, অস্ট্রেলিয়া এখনো পুরোপুরি চীনের বিকল্প হতে পারবে না। “যদি [অস্ট্রেলিয়ার] লক্ষ্য হয় পশ্চিমা বিশ্বকে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করা, তাহলে কিছু দুর্বল দিক রয়েছে যেগুলিতে চীন প্রবেশ করতে পারে — আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিশোধন।”


