রয়টার্স রিপোর্ট – গত রোববার চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং তিব্বতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু করার ঘোষণা দেন। বলা হচ্ছে, পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এটি যুক্তরাজ্যের সারা বছরের বিদ্যুতের চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে।
উজানে চীন যে নদীর ওপর এই বাঁধ নির্মাণ করছে, সেই ইয়ারলুং জাংপো নদীই ভারতে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্র নাম নিয়ে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে ভাটির দেশগুলোতে পানির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
তিব্বত মালভূমিতে ইয়ারলুং জাংপো নদীর যে অংশে নতুন জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে নদীর একটি অংশ ৫০ কিলোমিটার (৩১ মাইল) চওড়া হয়ে প্রায় ২ হাজার মিটার (৬ হাজার ৫৬১ ফুট) উঁচু থেকে নিচে প্রবাহিত হয়েছে, যা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সেখানে ধাপে ধাপে পাঁচটি বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
২০৩০-এর দশকের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই এই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পের ব্যয় ও সম্ভাব্য সময়সীমা ছাড়া এর নির্মাণ পদ্ধতি সম্পর্কে চীন এখনো তেমন কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
তথ্যের এ ঘাটতি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পানির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র নদ কৃষিকাজ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও পানীয় জলের জন্য দুই দেশেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল মঙ্গলবার বলেছে, ইয়ারলুং জাংপো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ চীনের সার্বভৌম অধিকারের অন্তর্গত বিষয়। চীনের যুক্তি, এই বাঁধ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহ করবে ও বন্যা প্রতিরোধ করবে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আরও বলা হয়–ইয়ারলুং জাংপো প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য, বন্যানিয়ন্ত্রণ এবং দুর্যোগ প্রশমন সহযোগিতা বিষয়ে চীন ভাটির দেশগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগও করেছে।
অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারত-চীন পানি সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সায়ানাংশু মোদক রয়টার্স-কে বলেন–এই বাঁধের কারণে ভাটির দিকে পানিপ্রবাহে যে প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা খানিকটা অতিরঞ্জিত। কারণ, ব্রহ্মপুত্র নদে যে বিপুল পরিমাণ পানি আসে তার বেশির ভাগই হিমালয়ের দক্ষিণে মৌসুমি বৃষ্টি থেকে আসে, চীন থেকে নয়।
মোদক আরও বলেন, চীনের পরিকল্পিত প্রকল্পটি একটি ‘রান অব দ্য রিভার’ ধরনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এর অর্থ হচ্ছে, ব্রহ্মপুত্র নদের স্বাভাবিক প্রবাহপথেই পানি প্রবাহিত হবে, এর গতিপথে বড় ধরনের বাধা দেওয়া যাবে না।
ভারত নিজেও এ নদীর ওপর দুটি বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। চীনের ইয়ারলুং জাংপো নদী ভারতে সিয়াং নাম নিয়ে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে অরুণাচল প্রদেশে যে বাঁধটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেটি ১১.৫ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রকল্প হওয়ার কথা। এটি বাস্তবায়িত হলে তা হবে ভারতের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।
ভারতের একটি নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে যে, ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত হলে চীন ইচ্ছাকৃতভাবে এই বাঁধ ব্যবহার করে পানির প্রবাহ বন্ধ করতে বা ঘুরিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের অভিযোগ–ভারত বিরোধপূর্ণ অঞ্চল কাশ্মীরে দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা পানির উৎসগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, বিশেষ করে নয়াদিল্লি সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিত করেছে।
চীনের নতুন জলবিদ্যুৎ বাঁধটি একটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে। ভূমিধস, হিমবাহ হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যা ও ঝড়ের জন্যও অঞ্চলটি ঝুঁকিপূর্ণ। এমন একটি এলাকায় বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে প্রকল্প বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে এ বছরের শুরুর দিকে তিব্বতে একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল স্টেকলার বলেছেন, এই বাঁধ শুধু পানিপ্রবাহ কমিয়ে দেবে, এমনটা নয়; বরং এই বাঁধের ফলে ভাটি অঞ্চলের দিকে পলি বা কাদামাটির প্রবাহও কমে যাবে। এই পলিমাটি ভাটির বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি পুষ্টি উপাদান বহন করে।
(সূত্র : রয়টার্স, প্রথম আলো)


