২১শ শতাব্দীর প্রযুক্তিগত বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রোবোটিক্স। বিশেষ করে মানুষের মতো দেখতে ও কাজ করতে সক্ষম হিউম্যানয়েড রোবট একটি রোমাঞ্চকর ও বিতর্কিত আবিষ্কার। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার নাম উঠলেও আজকের দিনে চীন এই দৌড়ে এক নতুন মহাশক্তি।
চীনে রোবোটিক্স নিয়ে কাজ শুরু হয় গত শতকের শেষ ভাগে, কিন্তু মূলধারায় আসে ২০০০ দশকের শুরুতে। তখনো জাপানের ‘আসিমো’ (ASIMO) কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার ‘হুবারো’ (Hubo) বিশ্বে আলোড়ন তুলছে। চীন অপেক্ষাকৃত নীরব থাকলেও, সরকার-সমর্থিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তখন নিজেদের প্রস্তুত করতে ব্যস্ত। বিশেষ করে ‘চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’ এবং ‘জিয়াংনান ইউনিভার্সিটি’ এর গবেষণায় বড় ভূমিকা রাখে।
২০১৫ সালে চীন “মেইড ইন চায়না ২০২৫” নামক জাতীয় কৌশল ঘোষণা করে, যেখানে রোবোটিক্স ছিলো অন্যতম মূল খাত। এই উদ্যোগের পর থেকে হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাণে চীন তার বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দক্ষতাকে একত্রিত করে দ্রুত অগ্রসর হয়। চীনের লক্ষ্য শুধুমাত্র রোবট বানানো নয়, বরং সেগুলোকে দৈনন্দিন জীবনে কার্যকরভাবে যুক্ত করা। যেমন: হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম, স্কুল, ব্যাংক, এমনকি থিয়েটার বা রেস্টুরেন্টেও রোবট কাজ করছে।
প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উল্লেখযোগ্য উদাহরণ
জিয়াওইস (Xiaoyi):
২০১৭ সালে, ‘জিয়াওইস’ নামক একটি রোবট চীনের মেডিকেল লাইসেন্সিং পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়। এটি ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যা AI ও হিউম্যানয়েড সিস্টেমকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের একটি নিদর্শন।
জিয়াওইস (Xiaomei) ও জিয়াওপাং (Xiaopang):
এই দুটি রোবট সামাজিক সহচর (social companion) হিসেবে তৈরি হয়েছে। শিশু ও বৃদ্ধদের সঙ্গে কথা বলা, আবেগ বোঝা, এমনকি গল্প বলা ও আবেগ প্রকাশ করা এই রোবটগুলো এই কাজগুলো বেশ ভালোভাবেই করতে পারে।
জিয়াওইচি (Xiao Qi):
২০২৩ সালে প্রকাশিত এই রোবটটি মানুষের হাঁটার গতি, মুখের অভিব্যক্তি ও স্বরভঙ্গি অনুকরণে অত্যন্ত পারদর্শী। এটি চীনের “Tsinghua University” এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান “UBTech” এর যৌথ উদ্ভাবন।
চীনা হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর পেছনে কাজ করে শক্তিশালী সেন্সর সিস্টেম, মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ও রিয়েল-টাইম ভিশন প্রসেসিং। হিউম্যানয়েড রোবটের ক্ষেত্রে “emotion detection” বা আবেগ শনাক্তকরণ এখন বড় এক গবেষণার কেন্দ্র। চীনের “iFlytek” কোম্পানি AI-ভিত্তিক ভয়েস রিকগনিশনে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে।
রোবটের অগ্রগতি যেমন চমকপ্রদ, তেমনি অনেক সামাজিক প্রশ্নও তুলছে। চীনের নাগরিকদের মধ্যে একাংশ মনে করে, রোবট ব্যবহারে মানবিক সংযোগ কমে যাবে, কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়বে। আবার অনেকে প্রশ্ন তোলে হিউম্যানয়েড রোবট যদি মানুষের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে তার দায় কে নেবে? এছাড়াও রোবটের মাধ্যমে নজরদারি, সেন্সরশিপ এবং ‘ডিজিটাল কনট্রোল’ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চীনের বিরুদ্ধে কিছু উদ্বেগও রয়েছে।
চীনে রোবট এখন শুধু কারখানা বা গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নয়। সাংহাই, শেনচেন কিংবা বেইজিংয়ের মতো শহরে রোবট থিয়েটার, আর্ট ইনস্টলেশন এমনকি কবিতা পাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। এইভাবে রোবট একটি সাংস্কৃতিক অংশ হয়ে উঠছে।
চীন ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের এক নম্বর AI এবং রোবট প্রযুক্তির শক্তি হতে চায়। বিশেষ করে বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির কারণে ‘সোশ্যাল রোবট’ এর চাহিদা বেড়েছে। ভবিষ্যতে হিউম্যানয়েড রোবটদের শিক্ষক, চিকিৎসক, পর্যটন গাইড এমনকি পারিবারিক সহকারী হিসেবেও ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। “Xiaomi”, “Huawei”, “UBTech” ও “CloudMinds” এর মতো চীনা টেক জায়ান্টরা এখন হিউম্যানয়েড রোবটকে ভোক্তা পর্যায়ে আনার চেষ্টা করছে—যা এক দশক আগেও ছিল কল্পনা।
চীনের হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তি শুধুমাত্র যান্ত্রিক উন্নয়নের নিদর্শন নয়, বরং এক নতুন সমাজ-সভ্যতার দিকচিহ্ন। মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে যে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে, তাতে চীন এখন এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। এই অগ্রগতি যেমন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে, তেমনি আমাদের ভাবনার জানালাও। এই প্রযুক্তি কি আমাদের কাজ কেড়ে নেবে, নাকি নতুন এক মানবিক সহায়ক সমাজ গড়ে তুলবে—এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতেই লুকিয়ে আছে।


