চীনের নেক্রোবিয়াল , ভালোবাসার কুসংস্কার – কুয়ানসা

চীনের গ্রামাঞ্চলের এক নিঃশব্দ সন্ধ্যায়, যখন আত্মীয়স্বজন মৃত তরুণের কবর প্রস্তুত করছে, ঠিক তখনই আরেকটি পরিবার মৃত এক তরুণীর দেহ নিয়ে হাজির হলো। কোনো শোক নয় বরং সে রাতে অনুষ্ঠিত হলো এক বিয়ে—কিন্তু বর ও কনে, দু’জনেই মৃত। এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, বরং চীনের এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক চর্চা—‘কুয়ানসা’ (Kwangsa) বা ‘Ghost Marriage’, যেখানে জীবনের পরে আসে ‘বিবাহ’। পুরনো রীতির ছায়া। এই নেক্রোবিয়াল বিবাহের শিকড় প্রাচীন চীন সমাজের কনফুসিয়ান বিশ্বাসে প্রোথিত। চীনাদের কাছে পুরুষের বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার, পূর্বপুরুষ পূজা, এবং সামাজিক মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন অবিবাহিত পুরুষ মারা গেলে পরিবার মনে করত তার আত্মা অশান্ত থাকবে, কারণ তাকে কেউ শ্রাদ্ধ বা পূর্বপুরুষ পূজা নিবেদন করবে না। এই প্রথা ছিল সেই আত্মাকে “নির্জনে না রেখে সঙ্গী দিয়ে শান্ত করা”—এমনকি মৃত্যুর পরেও।

কীভাবে হয় এই বিয়ে?

চীনের গ্রামীণ অঞ্চলে, বিশেষত শানসি, হেনান এবং হেবেই প্রদেশে এই বিবাহকে সম্পন্ন করা হয় একেবারে প্রচলিত বিয়ের মতোই। দুটি কফিন পাশাপাশি রাখা হয় এবং “বিবাহ” অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় পুরোহিত বা স্থানীয় শামানের নেতৃত্বে। অনেক সময় কনে বা বর জীবিত, আর অপরজন মৃত। সেই অবস্থায় কনে বা বরকে “জীবনের বাকিটা” ওই মৃত সঙ্গীর সাথেই অতিবাহিত করতে হয় কখনও বিবাহ পরবর্তী যৌনতা বা অন্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধা দেয়া হয়।আর যদি বর ও কনে দুজনেই মৃত হয়, তাহলে বিশেষ ধরণের দালাল (যাদের বলা হয় “মিডলম্যান অফ দ্য স্পিরিট”) বাজারে কঙ্কাল বা দেহাংশ সংগ্রহ করে “উপযুক্ত মিল” খুঁজে দেয়। অনেক সময় মৃত কন্যার জন্য দেহ কেনা হয়, যার দাম পৌঁছায় কয়েক হাজার ইউয়ানে।

যেখানে সংস্কৃতি সেখানে শোষণও জন্ম নেয়। চীনের এই ঘোস্ট ম্যারেজ রীতিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অবৈধ কঙ্কাল বাজার। বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা গেছে, মরদেহ চুরি, মহিলা কঙ্কাল পাচার, এমনকি হত্যা করে দেহ বিক্রির ঘটনাও ঘটছে শুধু এই বিবাহের চাহিদা পূরণ করতে। ২০১৩ সালে চীনের একটি গ্রামে দুই কবর খুঁড়ে তরুণীদের কঙ্কাল চুরি করা হয় ঘোস্ট ম্যারেজের জন্য। সরকার এ নিয়ে একাধিকবার অভিযান চালালেও গ্রামীণ সংস্কৃতির গায়ে সে থাবা আজও লেগে আছে।

কেন এই রীতিকে আঁকড়ে ধরে আছে এত মানুষ?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন এটি এক ধরণের শোকের পুনর্নির্মাণ। মৃত প্রিয়জনকে বিয়ে দিয়ে সমাজের কাছে একটা ‘সমাপ্তি’ ঘোষণা করা হয়। এটা পরিবারের জন্য এক ধরণের closure, একটা জীবন বা গল্পের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি বানানো। তাদের কাছে এটি শুধুই সংস্কার নয়, বরং প্রিয়জনের অমরত্বের কল্পনায় একটা সহানুভূতির রূপ । চীনের আধুনিক সমাজে এই রীতি এখন অত্যন্ত বিতর্কিত। অনেক শহুরে তরুণ-তরুণী একে প্রতীকী পশ্চাৎপদতা ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন মনে করেন। তবু রীতিটি এখনও অস্তিত্ব বজায় রেখেছে, শুধু পালটে গেছে তার রূপ। বর্তমানে অনেক পরিবার প্রতীকী ঘোস্ট ম্যারেজ করে কাগজের effigy, কনফেটি, কৃত্রিম দেহাংশ ব্যবহার করে। সামাজিক সম্মান ও আত্মার শান্তি, দুই-ই বজায় রাখার এই মধ্যপন্থা’ই এখন নতুন বাস্তবতা। ‘কুয়ানসা’ শুধু একটি অদ্ভুত সংস্কৃতি নয়—এটি জীবন ও মৃত্যুর ধারণার সীমা নিয়ে ভাবার এক চ্যালেঞ্জ। যেখানে মৃত্যুও সামাজিক কাঠামোর বাইরে নয়। বরং মৃত্যুও ‘পূরণীয় দায়িত্ব’ হয়ে ওঠে।

এটি একদিকে যেমন সংস্কৃতির অন্তর্গত অমানবিকতা তুলে ধরে, অন্যদিকে আমাদের জীবনের অর্থ, সম্পর্কের পরিণতি, এবং সম্মানবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবায়। চীনের এই ‘মৃত্যুর পরে বিয়ে’ প্রথা শুনতে যতই অদ্ভুত লাগুক, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস, শোক ব্যবস্থাপনার মনস্তত্ত্ব এবং এক গভীর মানবিক আকুতি—‘মৃত্যুর পরেও যেন অজানা অচেনা দিগন্তে কেউ একা না থাকে’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন