গুরুত্বপূর্ণ খনিজের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মঙ্গলবার একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জন্য জরুরি এসব বিরল খনিজের ক্ষেত্রে চীনের আধিপত্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের প্রেক্ষিতে এ ঘোষণা আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ‘কোয়াড’ নামে পরিচিত এই চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ওয়াশিংটনে স্বাগত জানান।চার দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, তারা ‘কোয়াড ক্রিটিকাল মিনারেলস ইনিশিয়েটিভ’ গঠন করছে, যার লক্ষ্য হলো সরবরাহ চেইন নিরাপদ ও বৈচিত্র্যময় করা।
যদিও বিবরণে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি, তবু এটি স্পষ্ট যে এই উদ্যোগের লক্ষ্য চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো। এর আগে, ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় চীন এসব খনিজের ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হিসেবে চীনে সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি সীমিত করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রক্রিয়াকরণ ও পরিশোধন এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদনের জন্য কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরশীলতা আমাদের শিল্প খাতকে অর্থনৈতিক চাপে, মূল্য নিয়ন্ত্রণে এবং সরবরাহ চেইনের বিঘ্নে ফেলতে পারে।”
চীন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় মজুদদার, যার মধ্যে বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য অপরিহার্য গ্রাফাইটের প্রায় সম্পূর্ণ মজুদ রয়েছে চীনের হাতে।
মন্ত্রীদের কেউই চীনের নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি, তবে তারা দক্ষিণ চীন সাগর ও পূর্ব চীন সাগরে “ঝুঁকিপূর্ণ ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে” উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা তাদের ভাষ্যে “এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি”।
ভারত ও জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেছেন, তারা চান কোয়াড “একটি স্বাধীন ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক”-এর ওপর গুরুত্ব দিক—যা এশিয়ায় চীনের আধিপত্যের বিরোধিতার সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বহন করে।
চীন প্রসঙ্গে কোয়াডের মধ্যে সাধারণ অবস্থান থাকলেও, অন্য কিছু ইস্যুতে পার্থক্য রয়েছে। যেমন—যৌথ বিবৃতিতে ইউক্রেন বা ইরানের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পরও ভারত রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, ভারত ও জাপান উভয়েরই ঐতিহাসিকভাবে ইরানের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ট্রাম্প কোয়াড দেশগুলোতেও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন।
ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারের (যেমন অভিবাসন) উপর ছয় মাস জোর দেয়ার পর কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এই বৈঠক ট্রাম্প প্রশাসনের পুনরায় এশিয়ায় চীনকেন্দ্রিক মনোযোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অনেকের জন্য বিস্ময় ছিল যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকে চীনকে অগ্রাধিকারে রাখেননি। বরং তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি সম্মানজনক বক্তব্য দেন এবং একটি বাণিজ্য যুদ্ধ এড়াতে দুই দেশের মধ্যে আপস করেন।
চলতি বছরের শেষদিকে ট্রাম্পের ভারত সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে কোয়াড শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই চার দেশের অংশীদারিত্ব প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন প্রয়াত জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। তিনি মনে করতেন, চীনকে ঘিরে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ‘নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে’ একটি জোট গঠন দরকার। চীন বারবার বলেছে যে, এই শত্রুতামূলক জোট তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ঠেকানোর একটি প্রচেষ্টা।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার কোয়াড বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে টেলিফোনে প্রায় ১৫ মিনিট কথা বলেছেন, যেখানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারের মতো বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।


