প্রায় দুই মাস দেরির পর অবশেষে খনিজ সম্পদ নিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত চুক্তিতে সই করেছে ওয়াশিংটন ও কিয়েভ। ফলে ওয়াশিংটন কিয়েভের মূল্যবান দুর্লভ খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার পাবে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে তার পুনর্গঠনে তহবিল জোগান দেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই চুক্তিকে কিয়েভের প্রতি নতুন ধরণের অঙ্গীকার বলে অভিহিত করেছে। দুই মাস আগে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-জেলেনস্কির তুমুল বাদানুবাদে চুক্তিটি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ট্রাম্পের দাবি, ওয়াশিংটন-কিয়েভের খনিজ সম্পদ চুক্তি সই ইউক্রেনের জন্য মঙ্গলজনক পদক্ষেপ এবং এর মাধ্যমেই দেশটি নিরাপদ থাকবে।
ইউক্রেন জানিয়েছে, দীর্ঘ দরকষাকষির পর গতকাল বুধবার যে চুক্তি সই হয়েছে, তাতে দেশটির স্বার্থ সুরক্ষিত হয়েছে। বিরল খনিজ সম্পদের ওপর পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌমত্বও থাকছে কিয়েভের। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ‘রেয়ার আর্থ’ নামে পরিচিত এসব খনিজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নিয়ে এতোটা আগ্রহী।
বিশ্বের বিরল ও প্রথাগত খনিজের পাঁচ শতাংশের মালিক ইউক্রেন। তবে দেশটির বেশিরভাগ খনিজ সম্পদ উত্তোলনের কোনো উদ্যোগ এখনো শুরু হয়নি। চলমান যুদ্ধের ফল হিসেবে খনিজ সমৃদ্ধ বেশ খানিকটা ভূখণ্ড রাশিয়ার দখলে চলে গেছে। বিশ্বের গ্রাফাইট মজুদের ২০ শতাংশ ইউক্রেনে। এটি ইলেকট্রিক ব্যাটারির অপরিহার্য উপকরণ। পাশাপাশি ম্যাঙ্গানিজ, টাইটানিয়াম ও লিথিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর মালিক দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র চায় চীনের খনিজ নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ বিরল খনিজ চীনের নিয়ন্ত্রণে। চুক্তির আওতায় ইউক্রেনের খনিজ, তেল, গ্যাস এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ক্ষেত্রগুলোর উন্নয়নে মার্কিন বিনিয়োগ হবে। প্রথম ১০ বছর শুধুমাত্র এই খাতগুলোর উন্নয়ন ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য অর্থ বিনিয়োগ করা হবে, যার পর লাভের একটি অংশ দুই দেশ ভাগ করে নেবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের জন্য এই চুক্তি প্রস্তাব করেন, যার মাধ্যমে ইউক্রেনকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের দাবি জানান। ট্রাম্পের দাবি ছিল, তার পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময় ইউক্রেনকে দেওয়া ১২০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পুনরুদ্ধার করা। চুক্তির একটি খসড়া যাচাই করে দেখেছে রয়টার্স। খসড়া বিশ্লেষণ করে তারা জানিয়েছে, পূর্ববর্তী মার্কিন সহায়তার জন্য ট্রাম্প অর্থ ফেরত চাইছিলেন, সেটা চুক্তিতে বাদ পড়েছে। ইউক্রেনের আপত্তি থাকা এই বিষয়টি বাদ পড়লেও খনিজসম্পদ চুক্তির বিনিময়ে ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তার কোনও শর্ত দেখতে পায়নি রয়টার্স। চুক্তির একমাত্র নিরাপত্তা সম্পর্কিত শর্তে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রয়াস চালাবে’।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনার কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে এই চুক্তি ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিভিন্ন ঘটনায় ওয়াশিংটন এবং কিয়েভের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন দেখা দিয়েছে। ইউক্রেনের আশা, রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্য মার্কিন সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
ইউক্রেন ইস্যুতে ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টা উদ্যোগ ও খনিজসম্পদ বিষয়ক চুক্তি দুটি ভিন্ন বিষয়। তবে এদুটো ক্ষেত্রেই ইউক্রেন যুদ্ধে ওয়াশিংটনের সামগ্রিক কৌশল প্রতিফলিত হয়।
ট্রাম্প এবার ক্ষমতায় এসেই মার্কিন নীতিতে আমূল পরিবর্তন এনে রাশিয়ার প্রতি নমনীয় অবস্থান নিয়েছেন। তিনি একাধিকবার বিভিন্ন কথায় সরাসরি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে যুদ্ধের জন্য দায়ী করেছেন। এমনকি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রুশ অধিকৃত ইউক্রেনীয় ভূমি ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিতেও কোনও রাখঢাক করেননি।


