“বার্লিন প্রাচীর ভাঙার মধ্য দিয়ে সোভিয়েত জমানার সমাপ্তি হলো। সেই সময় থেকে শুরু করে ওয়াশিংটনের বর্তমান কূটনৈতিক দপ্তরগুলো একটা ভুল ধারণা নিয়ে রয়ে গেছে। আর তা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বর্তমান প্রতিযোগিতা পুরোনো সোভিয়েত যুগের মতোই এক ঠান্ডা যুদ্ধের ছকে চলবে।
… বাস্তবতা হলো, চীন আর সোভিয়েত ইউনিয়ন এক নয়। চীন বিচ্ছিন্ন কোনো সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নয়। বা অতিরিক্ত সামরিক ব্যয়ের চাপে জর্জরিত কোনো সাম্রাজ্য নয়। চীন একটি বিশ্বায়িত, প্রযুক্তিচালিত, সভ্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র। চীনের আছে অর্থনৈতিক শক্তি, দক্ষ প্রশাসন এবং সাফল্যের ধারাবাহিকতা। চীন বিশ্বরাজনীতিতে মস্কোর মতো কোনো ভূমিকা নিতে রাজি নয়।
… বিশ্বরাজনীতিতে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে আমেরিকা তৈরি করেছিল এক নতুন রেসিপি। ঘেরাও, প্রতিরোধ, মতাদর্শ প্রচার এবং ধ্বংসের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করা। আজ মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা সেই পুরোনো ফর্মুলাই চীনের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে চাইছেন।
কিন্তু এবার প্রতিপক্ষ সেই আগের মতো নয়। চীন কোনো দুর্বল আদর্শিক জোট নয়। সে বরং একটি টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা। সেখানে প্রযুক্তি, পুঁজিবাদ এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে কাজ করছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পশ্চিমা অর্থনীতি থেকে একরকম বিচ্ছিন্ন ছিল। আর চীন এখন সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছে।
… ১৯৭৮ সালে দেং শিয়াও পিংয়ের নেতৃত্বে ‘সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ’ নীতি চালু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু চীন কখনো তার অর্থনীতিকে পশ্চিমা শর্তে পুরোপুরি উন্মুক্ত করেনি। ২০০১ সালে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় যোগ দিলেও, বেইজিং তার অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বিদেশি পুঁজির হাতে তুলে দেয়নি।
… চীনকে ঠান্ডা যুদ্ধের ছকে ঘেরাও করার মার্কিন কৌশল শুধু ভুল নয়, বিপজ্জনকও বটে। এই কৌশলের পেছনে একটা ধারণা কাজ করছে। আর তা হলো প্রতিপক্ষ একদিন নিজের ভেতরের সমস্যায় নিজেই ধসে পড়বে। আর তার জন্য প্রয়োজন হবে বিশ্বজুড়ে ছড়ানো ও বিপুল ব্যয়ে পরিচালিত কৌশল।
কিন্তু আজকের বাস্তবতা আলাদা। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর ১৯৫০ সালের মতো কোনো শিল্পের দিক দিয়ে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র নয়। আমেরিকার অর্থনীতি এখন অনেকটাই পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল। অর্থাৎ শিল্পোৎপাদনের চেয়ে ডলার আধিপত্য ও আর্থিক প্রভাবের ওপর তারা নির্ভরশীল।
এর বিপরীতে চীন এখন ‘বিশ্বের কারখানা’। আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা, পণ্যপ্রবাহ এবং অবকাঠামো নেটওয়ার্কে চীনের অংশগ্রহণ গভীর ও বিস্তৃত।
… লাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত, চীন শুধু বিশ্বায়নের অংশগ্রহণকারী নয়, তারা এখন বিশ্বপ্রযুক্তি বদলের শর্তই নির্ধারণ করছে।
… চীনের বিরুদ্ধে একটি বৈশ্বিক জোট গঠনের চিন্তা করার সময় মার্কিন জোটগুলো নিজেদের ভেতরকার অসংগতি বিবেচনায় রাখে না। পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, আরব উপসাগর কিংবা এমনকি আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যেও চীনের প্রতি মনোভাব একরকম নয়। অনেকে চীনের ভূমিকায় উদ্বিগ্ন। কিন্তু তারা যুক্তরাষ্ট্রের মতো করে বৈশ্বিক সংঘাতে যেতে আগ্রহী নয়। কারণ, তাদের নিজেদের অর্থনীতি চীনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
… চীন আর আমেরিকার মধ্যকার এই প্রতিযোগিতা কোনো মতাদর্শের নয়। এটি প্রযুক্তি, শিল্প ও ভূরাজনীতির প্রতিযোগিতা। তাই এটিকে কোনো বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হতে দেওয়া উচিত নয়।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা জেতার উপায় সোভিয়েত ধাঁচের পতনের অপেক্ষা নয়। বরং দরকার যুক্তরাষ্ট্রের নিজের কৌশলগত শক্তি বজায় রাখা। নতুন করে শিল্পায়ন, সামাজিক সহনশীলতা ও একটি ন্যায্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।…”


