কখনও ভেবে দেখেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের শুরুটা কোথা থেকে হয়েছিল? আজকের আধুনিক হাসপাতাল বা সিটি স্ক্যান মেশিন নয়, চিকিৎসার প্রথম ধারণা এসেছিল আত্মার দুর্বলতা নিয়ে, দেহের নয়। দেহের অসুখ দেখা হতো আত্মিক ভারসাম্যহীনতার ফল হিসেবে।আর সেই আত্মাকে সারানোর জন্য প্রয়োজন হতো শুধু হার্বাল ওষুধ নয়, প্রয়োজন হতো মন্ত্র, রিচুয়াল, নক্ষত্রের অবস্থান এবং এমনকি আত্মিক শক্তির সাথে যোগাযোগ!
এই জায়গা থেকেই শুরু হয় জাদুবিদ্যার চিকিৎসার ইতিহাস যেখানে চিকিৎসা মানেই ছিল একরকম গোপন চর্চা, যেখানে বিজ্ঞান, ধর্ম, জ্যোতিষ আর আধ্যাত্মিকতা মিশে ছিল একই পাত্রে।
প্রাচীন সুমের, মিশর, ভারত, চীন সভ্যতাগুলো রোগকে শুধু দেহগত নয়, বরং ঈশ্বরের অভিশাপ, আত্মার ভারসাম্যহীনতা, বা শত্রুর জাদুবিদ্যার ফলাফল হিসেবে দেখত। সুমেরীয়রা রোগ সারাতে যেসব ট্যাবলেট ব্যবহার করত, তাতে লেখা থাকত ঈশ্বরের নাম। মিশরের “Ebers Papyrus” নামক চিকিৎসাগ্রন্থে এমন অনেক রেসিপি আছে যেখানে মন্ত্র না পড়লে ওষুধ কাজ করবে না। অর্থাৎ চিকিৎসা মানেই ছিল ম্যাজিক!
১৬শ শতাব্দীর রহস্যময় চিকিৎসক পারাকেলসাস বলতেন “রোগের উৎস শরীর নয়, আত্মা। আর চিকিৎসা তখনই কার্যকর হয়, যখন দেহের উপাদানগুলোর সঙ্গে আত্মার শক্তি মিলিয়ে দেওয়া যায়।” তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রত্যেক রোগের পেছনে আছে এক প্রকার elemental spirit—যেমন আগুন, পানি, বাতাস, পৃথিবী বা ধাতুর চেতনা। সে অনুযায়ী তিনি ওষুধ বানাতেন ধাতু ও গাছের মিশ্রণে এবং সেই ওষুধে প্রয়োগ করতেন বিশেষ মন্ত্র।
আধুনিক চিকিৎসা যেখানে রোগের উৎস খুঁজে বেড়ায় রক্ত আর কোষে, জাদুচর্চা সেখানে খুঁজে বেড়ায় রোগের জ্যোতিষগত অবস্থান।মধ্যযুগে বিশ্বাস করা হতো, চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহের প্রভাব সরাসরি মানুষের যকৃত, হূৎপিণ্ড বা মনোভাবের উপর পড়ে। Indian Ayurveda বা চীনা Tao medicine-এ energy meridian বা চক্র ছিল শরীরের অদৃশ্য সেতু, যার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে রোগ হত। এই ধারণা পরবর্তীকালে “aura cleansing”, “chakra healing” বা “sound vibration therapy”-র জন্ম দেয়।
ইংল্যান্ডের রাণী এলিজাবেথের গোপন পরামর্শক ড. জন ডি, তার কালো আয়না ব্যবহার করে ‘এনোকিয়ান ফেরেশতা’-দের সাথে যোগাযোগ করতেন । – তার বিশ্বাস ছিল, এই আত্মিক শক্তিরাই শরীরের গোপন ব্যাধির উৎস জানে এবং নিরাময়ের পথ বলে দিতে পারে। আজকের দৃষ্টিতে এটি অবৈজ্ঞানিক হলেও কিন্তু occult tradition-এ এটিই ছিল “celestial diagnosis”।
প্রাচীন Druids বা ভারতীয় অরণ্যসাধকরা বিশ্বাস করতেন প্রতিটি গাছের নিজস্ব আত্মা আছে। তুলসী, মরিচ, নিম এসব উদ্ভিদের ব্যবহার কেবল ঔষধি নয়, বরং এক ধরনের “spirit-hosting”। রিচুয়াল করে গাছের আত্মাকে আহ্বান করে, ওষুধ প্রস্তুতের আগে সেই গাছের আশীর্বাদ নেওয়া হতো। এই চর্চা অনেকটা আজকের “Plant Intelligence” ধারণার সাথে মিলে যায়।
আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞান জাদুচর্চা থেকে দূরে অবস্থান করলেও Placebo effect, sound healing, guided imagery, এসব পদ্ধতিতে সেই আদি occult বিশ্বাস এখনও জীবিত। মানুষ যখন চেতন এবং অবচেতনের সীমান্তে গিয়ে রোগকে চিনতে শেখে, তখন সে এক প্রকার inner alchemy-র ভিতর দিয়ে যায়, এটি ঠিক occult-চিকিৎসার মতোই।


