চার গুণ বেশি CO2 শোষণ করতে পারে ‘মস’

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুতর বৈশ্বিক সমস্যা, যার মূল কারণ হলো বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) এবং অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের অতিরিক্ত নিঃসরণ। পরিবেশগত স্থিতিশীলতা রক্ষায় গাছপালা CO2 শোষণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মস (Moss) গাছের তুলনায় চার গুণ বেশি CO2 শোষণ করতে সক্ষম এবং এটি মাটির প্রয়োজন ছাড়াই বেঁচে থাকতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো মসকে আধুনিক নগরায়নের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি সম্ভাবনাময় উদ্ভিদ হিসেবে প্রমাণ করেছে।

মস হলো একটি ছোট আকারের ব্রায়োফাইট উদ্ভিদ, যা সাধারণত মাটির উপর, পাথরের ফাঁকে বা অন্যান্য কঠিন পৃষ্ঠে জন্মায়। মাটির প্রয়োজন ছাড়াই বেঁচে থাকার ক্ষমতা মসকে শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সবুজায়নের জন্য উপযুক্ত করে তোলে, যেখানে মাটির অভাব থাকে। মসের এই বিশেষত্ব নগর পরিবেশে কার্বন শোষণ বৃদ্ধিতে নতুন ধারণা প্রদান করে।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, মস গাছের তুলনায় চার গুণ বেশি CO2 শোষণ করতে পারে। অর্থাৎ একই পরিমাণ এলাকায় মস গাছের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় একটি কার্যকরী সমাধান হতে পারে। এছাড়া মসের উপস্থিতি নগর এলাকায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক। এটি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে তাপ শোষণ করে শহরের তাপমাত্রা প্রায় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে আনে, যা গ্রীষ্মকালে শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পানি শোষণের ক্ষেত্রে মস অত্যন্ত দক্ষ। এটি নিজের ওজনের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ পর্যন্ত পানি ধারণ করতে সক্ষম, যা বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং শুষ্ক মৌসুমে আর্দ্রতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি মস বায়ুমণ্ডল থেকে ক্ষতিকর কণা ও দূষণ উপাদান শোষণ করে শহরের বায়ুমণ্ডলকে পরিশুদ্ধ রাখে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো নগর পরিবেশে মসের বহুমুখী প্রভাবকে প্রমাণ করে।

তবে এই মূল্যবান উদ্ভিদটি নগর ব্যবস্থাপনায় যথাযথ গুরুত্ব পায় না। সাধারণত মসকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে সরিয়ে ফেলা হয়, যা পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষতিকর। মসের সংরক্ষণ ও ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে নগর পরিবেশের গুণগত মান উন্নত করা সম্ভব।

বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত নগর যেমন টোকিও, সিয়াটল এবং ইউরোপীয় শহরগুলো ইতোমধ্যেই মসের ব্যবহার শুরু করেছে। তারা নগরের দেয়াল, ছাদ এবং অন্যান্য পৃষ্ঠে মস লাগিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও বায়ু পরিশোধন করছে, যা টেকসই নগরায়নের দিক থেকে একটি উদাহরণ।

মস একটি প্রাচীন ব্রায়োফাইট উদ্ভিদ হলেও আধুনিক পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অত্যন্ত কার্যকর। এটি গাছের তুলনায় চার গুণ বেশি CO2 শোষণ করে, মাটির প্রয়োজন ছাড়াই বেঁচে থাকে এবং নগর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর পরিবেশ উন্নয়নের জন্য মসকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ ও প্রচার করা উচিত। এটি পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি কার্যকরী এবং সহজলভ্য উপায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন