যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য সফর করেন। এই সফর ছিল বিশ্বমঞ্চে তিনি নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করতে চান, তার একটি নিখুঁত উদাহরণ। এসময় তাকে দেওয়া হয়েছে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা, পেয়েছেন শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি ও প্রশংসায় ভরা বক্তব্য।
উপসাগরীয় অঞ্চলের শীর্ষ নেতারা ট্রাম্পকে এমন সম্মান দিলেও বিশ্বের সব দেশ কিন্তু একই পথে হাঁটেনি। কয়েক সপ্তাহ ধরে চীন তো কোনও প্রশংসাই করেইনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও আগ্রহ দেখায়নি বেইজিং। উভয় দেশের আরোপিত শাস্তিমূলক শুল্ক বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা তৈরি করলেও চীন ছিল নীরব।
তবে প্রশংসা না পেলেও ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত পিছু হটেন। গত সোমবার লেক জেনেভার তীরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কর্মকর্তারা পারস্পরিক শুল্ক আরোপে নাটকীয়ভাবে হ্রাস করার সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে— চাটুকারিতা নাকি মোকাবিলা? ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর প্রায় চার মাস কেটে গেছে, কিন্তু এখনও বিশ্বনেতারা দ্বিধায় ভুগছেন, তাকে কীভাবে সামলাবেন।
ট্রাম্প একজন খামখেয়ালি ও অপ্রত্যাশিত নেতা। তার লক্ষ্য বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা। তিনি বাণিজ্য থেকে শুরু করে সংঘর্ষ নিষ্পত্তি পর্যন্ত সবখানেই চুক্তি করতে চান।
কিছু দেশ উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো পথ বেছে নিচ্ছে—বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দিচ্ছে এবং ট্রাম্পের অহংবোধকে তুষ্ট করতে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করছে। অন্যদিকে কিছু দেশ সরাসরি বিরোধিতা করছে এবং আরও বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
যুক্তরাজ্য ট্রাম্পকে শান্ত রাখতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে এবং দ্রুত একটি বাণিজ্য চুক্তিও করতে সক্ষম হয়েছে। এই চুক্তি কয়েকটি খাতে সীমাবদ্ধ থাকলেও প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্পকে বলেন, “এটি আপনার নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক।”
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একেবারেই আলাদা পথে হাঁটছে। তারা মনে করে, দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি লাভবান হবে। অবশ্য এ পথে কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশ্বনেতারা বুঝে গেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হতে পারে, তবে তা পুনর্গঠন করাও সম্ভব। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এখন ট্রাম্পের সঙ্গে আগের চেয়ে ভালো সম্পর্কে রয়েছেন। যদিও ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে তাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল।
ট্রাম্প সম্প্রতি ইউক্রেন নিয়ে তুলনামূলকভাবে নরম অবস্থান নিয়েছেন। যদিও এর আগে তিনি কিয়েভের প্রতি বিরূপ ছিলেন এবং রাশিয়ার একপেশে শান্তিচুক্তির দাবি সমর্থন করেছিলেন। ট্রাম্পের এই পরিবর্তিত মনোভাব ইউরোপীয় দেশগুলোর আশাবাদ বাড়িয়েছে। তারা আশা করছে, বাণিজ্যসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও ট্রাম্প হয়তো এখন থেকে কিছুটা নমনীয় হবেন।
চীনের রেনমিন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ওয়াং ইওয়েই বলেন, “ট্রাম্পের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে চীনের সফল প্রতিরোধের একটি শিক্ষা হলো—তাকে খুশি করতে গিয়ে নতি স্বীকার করা যাবে না।” তার মতে, বৈশ্বিক মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার পক্ষে থাকা দেশগুলোর উচিত ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকা।
নিউইয়র্কভিত্তিক ফার্স্ট ঈগল ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক ইদান্না অ্যাপিও বলেন, “বিশ্বের খুব বেশি দেশ চীনের কৌশল সরাসরি অনুসরণ করতে পারবে না। কারণ তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা চীনের মতো নয়। তবে শিক্ষা হলো—ট্রাম্প পর্যাপ্ত চাপ অনুভব করলে পিছু হটেন। সেক্ষেত্রে নিজ দেশে কিছুটা ক্ষতি মেনে নেওয়া সার্থক হতে পারে।”
হাডসন ইনস্টিটিউটের রাফ বলেন, “চীন একটি ভিন্ন শ্রেণির দেশ। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সুরক্ষার উপর নির্ভরশীল নয়। ফলে তারা বাণিজ্য নিয়ে এমনভাবে সংঘাতে যেতে পারে, যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা পারবে না।”


