দেশজুড়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আবারও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এডিস মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৬৮৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭৮২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, একই সময়ে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন। এ নিয়ে দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২১৫।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৪৯৫ জন পুরুষ এবং ২৮৭ জন নারী। সর্বাধিক রোগী ভর্তি হচ্ছেন রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে। গত ২৪ ঘণ্টায় যে তিনজন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে দুজন ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও মুগদা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। অপর একজনের মৃত্যু হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক এবং তা আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও খারাপ হতে পারে। কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার মনে করেন, এ বছর প্রলম্বিত বর্ষা মৌসুম এবং সাম্প্রতিক সরকারি ছুটির সময় মশক নিধন কার্যক্রমে শিথিলতা ডেঙ্গু বিস্তারের অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, “প্রলম্বিত বর্ষার কারণে এখন ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমরা অনুমান করছি, আগামী কয়েক সপ্তাহ পরিস্থিতি আরও অবনতি হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের পর্যাপ্ত প্রস্তুতির ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।”
পরিসংখ্যান বলছে, ডেঙ্গু এখন আর রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ নয়। ২০০০ সালে দেশে যখন নতুন করে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তখন তা মূলত ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সব অঞ্চলে। চলতি বছর ঢাকার বাইরে আক্রান্তের সংখ্যা ঢাকার চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি। এখন পর্যন্ত ঢাকার বাইরে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৭ হাজার ৪৯ জন, আর ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ হাজার ৬৪০ জন।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সেপ্টেম্বরে দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তখনই জনস্বাস্থ্যবিদদের একাংশ সতর্ক করেছিলেন অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও নাজুক হতে পারে। বাস্তব চিত্রেও সেই আশঙ্কা সত্যি হতে শুরু করেছে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই দেশে একদিনে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত ২১ সেপ্টেম্বরের মৃত্যুর সংখ্যার সমান।
বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অনেক ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শহরাঞ্চলে পরিত্যক্ত টায়ার, ড্রাম, ফুলের টবসহ যেসব জায়গায় পানি জমে থাকে, সেখানে মশার প্রজনন রোধে তদারকি জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় এ বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি সংকট নয়, এটি পরিণত হচ্ছে সারাবছরব্যাপী জনস্বাস্থ্যঝুঁকিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির ঘাটতি এবং জনগণের অসচেতনতা দূর না হলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।


