চট্টগ্রাম বন্দরের মোট ৪টি টার্মিনাল রয়েছে। চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ-জিসিবি(কন্টেইনার ও বাল্ক) এবং পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। এরমধ্যে জিসিবি প্রধানত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় চলে। এর ৬টি জেটি পৃথকভাবে পরিচালনা করছে বেসরকারি ৬ বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠান। এনসিটি ও সিসিটি এই দুটি টার্মিনালই ২০০৯ সাল থেকে পরিচালনা করে আসছে বেসরকারি সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। সদ্য চালু হওয়া পিসিটি পরিচালনার দায়িত্ব ২০২৪ সালে সৌদি আরব ভিত্তিক ‘রেড সি গেইটওয়ে’-কে ২২ বছর মেয়াদি পিপিপি চুক্তিতে দেয়া হয়েছে।
৪টি জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা থাকা এনসিটি বছরে ৪৪%, ২টি জাহাজের সক্ষমতা সম্পন্ন সিসিটি ১৯% এবং ৩টি জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতায় জিসিবি ৩৭% কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। পিসিটি-তে যন্ত্রপাতি যোগ না হওয়ায় এখনো পুরোদমে কার্যক্রম শুরু হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে ৩২ লাখ ৭৫ হাজার একক (প্রতিটি ২০ ফুট দীর্ঘ হিসাবে) কন্টেইনার উঠানামা করেছে ও ১২ কোটি টন বাল্ক পণ্য হ্যান্ডেল করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ও সিসিটির যে সক্ষমতা, সেটি ইতোমধ্যেই পূর্ণ হয়ে গেছে। এনসিটিতে বছরে ১১ লাখ একক কন্টেইনার উঠানামার সক্ষমতা আছে। এখন হচ্ছে পৌনে ১৩ লাখ একক।
বন্দর সম্প্রসারণের বিষয়টি মাথায় রেখে ও বেশি ড্রাফটের বড় জাহাজ (মাদার ভ্যাসেল) ভেড়ানোর লক্ষ্যে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকায় ‘বে-টার্মিনাল’ প্রকল্প করার কাজ ২০১৪ সালে হাতে নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। হালিশহরের উপকূলীয় এলাকার ৯৩৯ একর ভূমিসহ সাগর ভরাট করে গড়ে তোলা প্রায় আড়াই হাজার একর জমিতে বে টার্মিনাল গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী ১ হাজার ২২৫ মিটার দীর্ঘ ২টি কনটেইনার টার্মিনাল, ১ হাজার ৫০০ মিটার দীর্ঘ ১টি মাল্টিপারপাস টার্মিনালসহ মোট ৪টি টার্মিনাল তৈরির কথা রয়েছে। যেখানে ১২ মিটার ড্রাফটের (জাহাজের পানির নিচের অংশের গভীরতা) এবং ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প হলো লালদিয়া বহুমুখী টার্মিনাল। চট্টগ্রাম বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, লালদিয়ার চর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। বহির্নোঙরের কাছাকাছি এবং কোনো বাঁক না থাকায় এই স্থানটি বন্দরের বিদ্যমান জেটিগুলোর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর একটি টার্মিনাল হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের মূল জেটি থেকে ভাটির দিকে নির্মিত পিসিটিতে ইতোমধ্যে ১০ মিটার ড্রাফট এবং ২০০ মিটার লম্বা জাহাজ ভিড়ানো সম্ভব হয়েছে। লালদিয়া টার্মিনালেও একই আকৃতির জাহাজ ভিড়ানো যাবে।
প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল প্রকল্পের প্রথম দুটি টার্মিনাল নির্মাণে প্রতিটির জন্য ১৫০ কোটি ডলার করে মোট ৩শ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল (সিঙ্গাপুর পোর্ট) এবং আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড বা দুবাই পোর্ট। এছাড়া আবুধাবি পোর্টস ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে যৌথভাবে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে।
এছাড়া প্রস্তাবিত লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার চুক্তির আলোচনা হচ্ছে ডেনমার্কের এপি-মুলার মায়েরস্কের সঙ্গে। তারা ৮০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এই টার্মিনাল নির্মাণ করবে। পিপিপি চুক্তির আওতায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই বিনিয়োগ করে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা করবে। এই ‘বিল্ড, অপারেট এণ্ড ট্রান্সফার’ (বিওটি) মডেলে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে টার্মিনালটি হস্তান্তর করবে চট্টগ্রাম বন্দরকে। কন্টেইনার প্রতি নির্দিষ্ট অর্থ তারা বন্দরকে দেবে।
ইতোমধ্যে বন্দরের প্রকল্পে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের জন্য ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফসিকে। তারা কি কি শর্তে টার্মিনালগুলো বিদেশি অপারেটরকে দেওয়া যায় তা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় গবেষণা করে রিপোর্ট প্রদান করবে।
এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আয়বর্ধক ও বড় টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল-এনসিটিও পরিচালনার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রস্তাব দিয়েছে। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই এই নিয়ে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও বিদেশি অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার বিষয়টি ইতিবাচক ভাবে দেখছে।
তবে এনসিটির বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। ২৪ এপ্রিল ২০২৫ সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান লিখিত বক্তব্যে বলেন, নিউমুরিং টার্মিনালটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ টার্মিনাল। এ টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য লাভজনক হবে কি না এবং বাংলাদেশের বন্দর পরিচালনার জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় জানিয়েছে, এ নিয়ে একটি সমীক্ষা এখন চলছে। “নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালটি পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের বিষয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ চলমান রয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রাপ্ত সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে,” লিখিত জবাবে সংস্থাটি জানিয়েছে।
নির্মাণ ও যন্ত্রপাতিসহ সব মিলিয়ে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ফলে বড় বিনিয়োগ হয়ে যাওয়ার পর চালু এ টার্মিনাল বিদেশী কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। অবশ্য বর্তমানে টার্মিনালটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে একটি দেশী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
সমালোচকরা বলছেন, মূলত কোনো বন্দরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে আনা হয় দুটো কারণে। এর একটি হলো বিনিয়োগ পাওয়া, আর অন্যটি হলো দক্ষতা বৃদ্ধি।
কিন্তু নিউমুরিং টার্মিনালে নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ তেমন নেই, পাশেই নৌঘাঁটি থাকায় এটি সম্প্রসারণেরও সুযোগ নেই। তারা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর এলে বন্দরের রাজস্বের সিংহভাগ চলে যাবে বিদেশে। এছাড়া বিদেশি অপারেটর এলে এনসিটির পণ্য ওঠানামার খরচ বাড়বে বলে মনে করেন তারা।
বে টার্মিনাল ও লালদিয়ার চরে প্রস্তাবিত নতুন টার্মিনালের কাজ বিদেশিদের দেয়া নিয়ে কেউ আপত্তি করছে না। এর কারণ হলো সেখানে জেটি নির্মাণ, ইকুইপমেন্ট ক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ও সুপার স্ট্রাকচার আনার সুযোগ আছে। একই কারণে পতেঙ্গা টার্মিনালের দায়িত্ব সৌদি প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও কোনো কথা ওঠেনি।
অন্যদিকে বলা হচ্ছে, বন্দর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অভিজ্ঞ ও দক্ষ বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া এখন বৈশ্বিক ট্রেন্ড বা প্রবণতা। পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃত একটি পদ্ধতি। বিদেশী অপারেটররা সারা বিশ্বে বিভিন্ন বন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এপি মোলার ৩৬টি দেশে ৬৫টি পোর্ট পরিচালনা করে, ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫০টি ইউনিটে কাজ করে, আর পোর্ট অফ সিঙ্গাপুর অথোরিটি ৪৫টি দেশে ৭৩টি টার্মিনাল পরিচালনা করে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে ৪গুণ বড় প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া নির্মাণ বা পরিচালনা করার মতো অবস্থা বন্দরের নেই। অথচ টার্মিনালটি দ্রুত নির্মিত হওয়া জরুরি। আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিদ্যমান বন্দর আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের চাহিদা পূরণ করার সক্ষমতা হারাবে। তার আগে যদি বে টার্মিনাল অপারেশনে না আসে তাহলে চড়া মূল্য দিতে হবে। একটি বিষয়ে সবাই প্রায় একমত, তা হচ্ছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা দরকার।দেশের স্বার্থ নিয়ে দর-কষাকষির ব্যাপারে যোগ্যতা ও আন্তরিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


