চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক বন্দর নগরী, দীর্ঘকাল ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এর ভৌগোলিক অবস্থান একে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক কার্যকলাপের সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত করেছে। তবে এই সমৃদ্ধ ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হলো স্লেভ ট্রেড বা দাস ব্যবসা। প্রথাগতভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে দাস ব্যবসার বিষয়টি খুব বেশি আলোচিত না হলেও, চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এর অস্তিত্বের প্রমাণ সুস্পষ্ট।
ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত চট্টগ্রামের উপকূল অঞ্চল ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দাস বন্দর, যেখানে পোর্তুগিজ জলদস্যু ও আরাকানিজ (মঘ) রাজা যৌথভাবে দাস ধরাশায়ী ব্যবসা চালাত।
দাসত্ব মানব ইতিহাসের এক প্রাচীন এবং বিশ্বব্যাপী ঘটনা। প্রাচীন সভ্যতাগুলো থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিভিন্ন রূপে দাসত্বের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশেও দাসত্বের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। স্থানীয় দাসত্বের পাশাপাশি, আরব, পারস্য, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ এবং ব্রিটিশ বণিকদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দাস ব্যবসাও এই অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। চট্টগ্রাম তার কৌশলগত অবস্থানের কারণে, এই আন্তর্জাতিক দাস ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
নবম শতাব্দীর আরব ভৌগোলিকদের লেখায় চট্টগ্রামের বন্দরের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা বোঝায় যে এই অঞ্চলটি তখন থেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি কেন্দ্র ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইবনে বতুতার ভ্রমণ কাহিনীতেও বাংলার সমৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক গুরুত্বের বর্ণনা রয়েছে। এই সময় থেকেই সম্ভবত আরব বণিকদের মাধ্যমে দাস আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে পর্তুগিজদের আগমন এবং তাদের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে চট্টগ্রামের দাস ব্যবসা এক নতুন মাত্রা পায়।
ষোড়ড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে চট্টগ্রাম ছিল পর্তুগিজ জলদস্যু এবং আরাকানি মগদের (আরাকান রাজ্যের স্থানীয় অধিবাসী) দস্যুতার এক আখড়া। এই সময়কালে পর্তুগিজরা চট্টগ্রাম এবং সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে তাদের বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে এবং স্থানীয় ক্ষমতাধরদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। তাদের মূল ব্যবসাগুলোর মধ্যে একটি দাস ব্যবসা।
পর্তুগিজ জলদস্যুরা বাংলার উপকূলীয় গ্রামগুলোতে হামলা চালাতো, মানুষকে ধরে নিয়ে যেত এবং তাদের দাস হিসেবে বিক্রি করে দিত। আরাকানি মগরাও এই কাজে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। তারা পর্তুগিজদের সাথে হাত মিলিয়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নারী, পুরুষ এবং শিশুদের ধরে নিয়ে যেত এবং তাদের ক্রীতদাস হিসেবে আরাকান এবং অন্যান্য অঞ্চলে বিক্রি করত।
ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী, পর্তুগিজ এবং আরাকানি জলদস্যুরা প্রায়শই সুন্দরবন এবং মেঘনা নদীর মোহনার মতো দুর্গম অঞ্চলে তাদের আস্তানা স্থাপন করত। সেখান থেকে তারা অতর্কিত হামলা চালিয়ে স্থানীয়দের অপহরণ করত। এই ক্রীতদাসদের মধ্যে অনেকেই ছিল কৃষক, জেলে এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। তাদের প্রধানত চাষাবাদ, গৃহস্থালি কাজ এবং বিভিন্ন ধরনের শ্রমসাধ্য কাজে ব্যবহার করা হত। এমনকি অনেক সময় এই দাসদের বার্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) নিয়ে গিয়েও বিক্রি করা হত, যেখানে তাদের প্রধানত কৃষি কাজে লাগানো হত। আরাকান রাজাদের কাছে পর্তুগিজদের উপহার হিসেবেও দাস পাঠানো হতো বলে জানা যায়।
চট্টগ্রামের দাস ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর উৎস এবং গন্তব্য। দাসদের একটি বড় অংশ ছিল বাংলার অভ্যন্তর থেকে অপহৃত সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে ঢাকা, নোয়াখালী, বরিশাল এবং খুলনার মতো অঞ্চলগুলো ছিল দাস অপহরণের প্রধান ক্ষেত্র। এই অঞ্চলগুলো থেকে অপহৃত দাসদের চট্টগ্রামে এনে জড়ো করা হতো এবং সেখান থেকে তাদের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হতো।
দাসদের গন্তব্যস্থলও ছিল বৈচিত্র্যময়। কিছু দাসকে চট্টগ্রামের স্থানীয় অভিজাত শ্রেণী এবং ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করত। বাকিদের আরাকান, সুমাত্রা, জাভা, মালয়েশিয়া এবং এমনকি ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে বিক্রি করা হতো। চট্টগ্রাম বন্দরের ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে এটি দাস ব্যবসার একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে কাজ করত। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বণিকরা চট্টগ্রামে দাস ক্রয়-বিক্রয় করত, যা এই ব্যবসাকে আরও বিস্তার লাভে সাহায্য করে।
চট্টগ্রামে দাস ব্যবসার অস্তিত্ব এই অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এটি সমাজের একটি বৃহৎ অংশের মধ্যে চরম অস্থিতিশীলতা এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিল। মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছিল এবং অপহরণের ভয়ে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দাস ব্যবসার কারণে একশ্রেণীর বণিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটেছিল, যারা এই অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জন করত। এটি সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি করেছিল এবং একটি অনুৎপাদনশীল অর্থনীতির জন্ম দিয়েছিল। দাসদের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হতো এবং তাদের সাথে অমানবিক আচরণ করা হতো।
১৬৬৬ সালে মোগল সেনাপতি শায়েস্তা খাঁ চট্টগ্রাম পুনর্দখল করেন। এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। এই পুনর্দখলের মাধ্যমে পোর্তুগিজ ও আরাকানিদের দাস ব্যবসার অবসান ঘটে। মোগল প্রশাসন বন্দরটির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং ধীরে ধীরে দাস ব্যবসার কার্যক্রম নিষিদ্ধ বা সীমিত করে। শায়েস্তা খাঁর এই অভিযান শুধুই সামরিক সাফল্য নয়, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের দিক থেকেও একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
চট্টগ্রামের দাস ব্যবসা উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি উপেক্ষিত অধ্যায়। অথচ এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে উপনিবেশিক আগ্রাসন, স্থানীয় রাজনীতি ও অর্থনৈতিক লোভ মিলে একটি জনগোষ্ঠীকে দাসত্বে পরিণত করতে পারে।


