২০০৮ সালে কানাডায় কেনেথ পার্কস নামের একজন ব্যক্তি তার শাশুড়িকে হত্যা করেন এবং শ্বশুরকে মারাত্মকভাবে আহত করেন।পরবর্তীতে জানা যায়, তিনি ঘুমের মধ্যে ছিলেন। আদালতে চিকিৎসকরা প্রমাণ দেন, পার্কস “স্বয়ংক্রিয় ঘুম অবস্থায়” এবং ঘটনার কোনো স্মৃতি তার ছিল না। বিচারকও তাকে নির্দোষ ঘোষণা করেন। একই ধরনের আরেকটি কেস ঘটে ১৯৯৭ সালে ইংল্যান্ডে, যেখানে ব্রায়ান থমাস নামের এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে গলা টিপে হত্যা করেন। পরে তিনি জানান, তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন তার স্ত্রী এক চোরে পরিণত হয়েছে। আদালতে প্রমাণ হয়, তিনি ছিলেন ঘুমের ভেতরে এক ধরণের ‘REM sleep behavior disorder’-এ আক্রান্ত। তাকেও দোষমুক্ত করা হয়।
২০১০ সালে ফ্লোরিডার স্কট ফ্যালার নামের এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে ছুরি দিয়ে হত্যা করেন এবং দুই সন্তানকে আহত করেন। ঘটনার সময় তিনি ঘুমাচ্ছিলেন বলে দাবি করেন। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তার আচরণ ছিল অসংলগ্ন এবং স্মৃতি বিভ্রান্ত। তদন্তে দেখা যায়, তিনি PTSD এবং ঘন ঘন স্লিপওয়াকিংয়ের সমস্যায় ভুগছিলেন। আদালতে একদল নিউরো-সাইকোলজিস্ট ব্যাখ্যা দেন, তার মস্তিষ্ক REM ঘুমের সময় সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় ছিল না। শেষ পর্যন্ত মামলাটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক বিবেচনায় মুলতবি রাখা হয়। এই কেসটি প্রমাণ করে, স্লিপ প্যারাসোমনিয়ার মধ্যে শুধু নিছক আচরণ নয়, ব্যক্তির মানসিক ইতিহাস, ট্রমা এবং ঘুমের গঠনও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে।
ঘুম একটি নিরাপদ আশ্রয়, শরীর ও মস্তিষ্কের আরামের জায়গা। কিন্তু কখনও কখনও সেই ঘুমই হয়ে ওঠে ভয়ংকর। ইতিহাস জুড়ে অনেক ঘটনা রেকর্ড হয়েছে যেখানে মানুষ ঘুমের মধ্যে অপরাধ করেছে, তাও আবার স্মৃতিচিহ্নহীনভাবে। এই অদ্ভুত ও ভয়াবহ অবস্থার নাম স্লিপ প্যারাসমনিয়া (Sleep Parasomnia)। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-এটি কি নিছকই নিউরোলজিক্যাল সমস্যা, নাকি এর পেছনে রয়েছে অদৃশ্য কোনো শক্তির ছায়া?
কী এই ‘স্লিপ প্যারাসমনিয়া’?
স্লিপ প্যারাসমনিয়া একটি স্লিপ ডিসঅর্ডার, যেখানে ব্যক্তি ঘুমের মধ্যে অচেতনভাবে বিভিন্ন ধরনের আচরণ করে-চলাফেরা, কথা বলা, এমনকি সহিংস কাজ। এই ধরনের ঘুমজনিত অস্বাভাবিক আচরণ সাধারণত REM (Rapid Eye Movement) এবং Non-REM ঘুমের মধ্যে ঘটে থাকে। Harvard Sleep Center অনুযায়ী প্যারাসোমনিয়ার আওতায় পড়ে, স্লিপওয়াকিং (ঘুমের মধ্যে হাঁটা), স্লিপ টেরর (হঠাৎ চিৎকার করে জেগে ওঠা), সেক্সোমনিয়া (ঘুমের মধ্যে যৌন কার্যকলাপ)
বিজ্ঞান কী বলে?
American Journal of Psychiatry অনুযায়ী, এই ধরণের প্যারাসোমনিয়া নিউরোলজিক্যাল ও সাইকিয়াট্রিক কারণে হতে পারে।মানুষের মস্তিষ্কের Limbic Szstem ঘুমের সময়ও কখনও সক্রিয় থাকে, যার ফলে সাড়া দেওয়ার মতো আচরণ তৈরি হয়। কিন্তু Prefrontal Cortex যেহেতু নিষ্ক্রিয় থাকে, তাই কোনো সিদ্ধান্ত বা মূল্যায়নের বোধ থাকে না। ফলস্বরূপ ব্যক্তি অচেতনভাবেই সহিংস হতে পারে। Forensic Psychology Studies-এ বলা হয়েছে, এই ধরনের ঘটনাগুলোর বিচার করা খুব কঠিন, কারণ এতে ব্যাক্তির ইচ্ছা বা মতলব থাকে না। এটি এক ধরনের “অটোম্যাটিজম”-যেখানে ব্যক্তি নিজেই নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
অনেক সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয়, ঘুমের সময় আত্মা শরীর ছেড়ে যায় এবং সেই সময় দুর্বলতা তৈরি হয়। যা কোনো অশরীরী শক্তি দখল করতে পারে। বাংলায় যাকে বলে “ভূতে চাপা”-তা অনেকাংশে স্লিপ পারালাইসিসের মতো হলেও প্যারাসোমনিয়ার ক্ষেত্রেও এমন ব্যাখ্যা দেয়া হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার অভাব সেখানে ঘুমের মধ্যে সহিংসতা বা অদ্ভুত আচরণকে ভূতের কাজ বলে মনে করা হয়। কিছু তান্ত্রিক বিশ্বাস অনুযায়ী, ঘুমের সময় ব্যক্তির উপর দখল নিতে পারে কোন আত্মা বা অপশক্তি। এগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও ঘটনাগুলোর রহস্যময়তা এই বিশ্বাসকে জিইয়ে রাখে।
যখন কেউ ঘুমের মধ্যে অপরাধ করে এবং তার কোনো স্মৃতি থাকে না, তখন আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উঠে। সে কি দায়ী? আদালত কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে? অনেক সময় মেডিকেল রিপোর্ট ও নিউরোসাইকোলজিকাল বিশ্লেষণই একমাত্র ভরসা হয়। তবে আইনশাস্ত্র এই ধরনের কেসে দ্বিধায় থাকে। ঘুমের মধ্যে খুন একটি জটিল, বিভ্রান্তিকর এবং ভীতিকর বাস্তবতা। বিজ্ঞান এর ব্যাখ্যা দেয়-মস্তিষ্কের বৈকল্য, REM ডিসঅর্ডার, অথবা প্যারাসোমনিয়া। কিন্তু প্রতিটি ঘটনা যেন এক একটি অজানা পর্দা উন্মোচন করে, যেখানে বিজ্ঞান থেমে যায় এবং কল্পনা শুরু হয়। হয়তো এইসব ঘুমের গল্প আমাদের দেখিয়ে দেয়, মানুষ এখনও তার নিজের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রক নয়!


