গ্রাফিতিতে ভুল প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়েছিল : আনু মুহাম্মদ শিক্ষক , লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

পরপর তিনটি নির্বাচনী তামাশার মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার পর রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের ৯ মাস পূর্ণ হলো। …দেয়ালের গ্রাফিতিতে সমাজের বিক্ষুব্ধ মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা, দাবি ও প্রত্যাশা প্রকাশিত হয়েছিল, সেটাই ঘোষণাপত্রের কাজ করেছে। সেখানে কথা, স্লোগান, ছবি, কার্টুনে জাতিগত, লিঙ্গীয়, শ্রেণিগত বৈষম্য এবং নিপীড়ন আধিপত্য স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত এক দেশের প্রত্যাশা প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে এর উল্টো তৎপরতা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। বৈষম্যবাদীদের দাপট বাড়তে থাকে। মাজার-মসজিদ, মন্দির, নারী, শিল্পকর্ম, ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি বিদ্বেষী ও আক্রমণাত্মক তৎপরতা বাড়ে। ভাস্কর্য, নাটক, গান, মেলা, গ্রন্থাগার ও শিল্প-সংস্কৃতির কেন্দ্র বহুবার আক্রমণের শিকার হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জোরজবরদস্তি করে কাউকে বসানো কাউকে নামানো।

নারী শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হিংসা-বিদ্বেষ, মব সহিংসতা চলতেই থাকে। আগের মতো চাঁদাবাজি দখল আবার শুরু হয়। শ্রমিক আন্দোলনে হামলা-মামলা, এমনকি গুলিও চলেছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে ধরপাকড় চলছে। শ্রমিক স্বার্থ রক্ষায় সরকার ১৮ দফা চুক্তি করলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। নিহত ও আহত ব্যক্তিদের নিয়ে এখনো যথাযথ তালিকা, পুনর্বাসন, চিকিৎসা সম্পন্ন হয়নি। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে যে টালবাহানা চলছে। তার প্রমাণ বাছবিচারহীনভাবে শিক্ষক, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা পাইকারি হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা। আর সঙ্গে অজ্ঞাতনামা শত শত আসামি। … কিন্তু বহুল আলোচিত ত্বকী, তনু, সাগর-রুনি, মুনিয়াসহ বহু মামলার সমাধান হয় না। ফুলবাড়ীতে ১২ বছরের পুরোনো হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার হয় না।

মিথ্যা মামলায় আটক দলিত-হরিজনদের জামিনের শুনানি পর্যন্ত হচ্ছে না। হাসিনা আমলে আদালতে বিচারের রায় কী হবে আমরা বুঝতাম। এখনো কে জামিন পাবে, কে আটকে থাকবে আগেই বোঝা যায়। এই সরকার যে সংস্কার বা পরিবর্তন করতে আগ্রহী, তার প্রকাশটা কোথায়? সংস্কার আর নির্বাচন নিয়ে অহেতুক বিতর্ক তোলা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কারগুলো করতে পারে, সেগুলো করতে বাধা কোথায়? ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে কৃষকের আত্মহত্যা বেড়ে গেছে। হিমাগার, কিংবা সরকারি ক্রয়ের মতো সাধারণ কাজগুলো করলে কৃষকের জন্য বড় একটা পরিবর্তন হয়।

মার্কিন কোম্পানি থেকে এলএনজি আমদানির চুক্তি করা হয়েছে পেট্রোবাংলাকে না জানিয়েই। অথচ আমাদের দরকার এলএনজি আমদানি, কয়লামুখী নীতি থেকে বের হয়ে আসা। তাই গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ক্ষেত্রে জাতীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে এই সম্পদ আমরা যাতে পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারি, সেই উদ্যোগ ছিল জরুরি। দরকার ছিল আদানি-রামপাল-রূপপুর চুক্তি বাতিলের রাস্তা তৈরি। ৯ মাসে এসবে সরকারের উদ্যোগ দেখা যায়নি। তারা গত সরকারের নীতিমালা অনুযায়ীই কাজ করে যাচ্ছে। স্টারলিংকের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। রাখাইনে করিডর এখন উদ্বেগ আর আলোচনার বিষয়। লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার বন্দোবস্ত হচ্ছে। দেশের মানুষ কিছুই জানে না। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বা বিশেষ সহকারীরা বললেই তো হবে না। দেশের মানুষকে তো জানতে হবে, তাদের জীবন-সম্পদ নিয়ে আসলে কী করা হচ্ছে। স্বচ্ছতা আর জবাবদিহির ব্যবস্থা না করে পুরোনো পথই কেন সরকারের পছন্দ?

এর মধ্যে ভালো কাজ হয়েছে ১১টা বিষয়ে কমিশন গঠন। সেগুলোর রিপোর্টও এসেছে। এর মধ্যে সংবিধান, নির্বাচন, গণমাধ্যম, প্রশাসন, নারী ও শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনগুলোতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ আছে, যেগুলো ৫ আগস্টের পর আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটিরও বক্তব্য ছিল। যেমন বলেছিলাম, ‘উত্তরাধিকার সূত্রে জমি-সম্পত্তিতে নারীদের সমানাধিকার নিশ্চিত করা এবং সব কাজে সমশ্রমে সমমজুরি নিশ্চিত করার কথা। যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে ২০০৯ সালের হাইকোর্ট নির্দেশনা অবলম্বন করে কারখানা-সচিবালয়সহ সব প্রতিষ্ঠানে ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা’ কার্যকর করা।’ শ্রমিক বিষয়ে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, নিয়মিত মজুরি পরিশোধের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ইত্যাদি অন্যতম। এ রকম অনেক সুপারিশই বর্তমান সরকার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারে।

সংস্কার কমিশনগুলোর রিপোর্ট নিয়ে সমাজে যথেষ্ট আলোচনা নেই। তবে ধর্মীয় দল-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে। উত্তরাধিকার প্রশ্ন কিংবা নারীর অধিকার প্রশ্ন এলেই বাংলাদেশের বৈষম্যবাদী রাজনীতি বা মতাদর্শ ধারণকারীদের ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। … নারীকে প্রতিপক্ষ ধরে তাদের সক্রিয়তা হুংকার যত আওয়াজ দেয়, সমাজের বৈষম্য, নিপীড়ন, জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতা নিয়ে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের অনেকগুলোর সঙ্গে আমরা একমত। তবে দুটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা দরকার। মূলনীতি নতুনভাবে দাঁড় করাতে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর যুক্তিটাই সমস্যাজনক।

বলা হয়েছে, ‘ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি সমাজ ও রাষ্ট্রে বিভক্তি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে…এটি বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।…’ কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিলে বহুত্ববাদ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক কী করে হয়? কারণ, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে-রাষ্ট্র সব ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকবে, সব ধর্ম–মতের মানুষকে ধারণ করবে। এতে কীভাবে ‘বিভক্তি ও বিভ্রান্তি’ তৈরি হয়? দেয়ালের গ্রাফিতিতে বহু জায়গায় বলা হয়েছে ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’। সেটাই ধর্মনিরপেক্ষতা।

শুধু অন্য ধর্মের মানুষ নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যেও বহু সংখ্যালঘু থাকে। তাদের জন্যও নীতি-বিধিব্যবস্থা প্রণয়নে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের আরও দাবি-এটি ‘অতীতে ফ্যাসিবাদী শাসনের আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে’। বস্তুত, উল্টো সেই শাসন তৈরি হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে প্রতারণা করে, ধর্মীয় গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে, নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা জারি করে, মুক্তিযুদ্ধকে অপব্যবহার করে এবং জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন ও পাচারের ব্যবস্থা করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার উদগ্র বাসনায়। সংবিধানের মূলনীতিতে ‘সমাজতন্ত্র’ ছিল অলংকার হিসেবে। তবে এটি বাদ দেওয়ার যুক্তিটিও ভুল। বলা হয়েছে, ‘সমাজতন্ত্র মূলত গণতন্ত্রবিরোধী শাসনব্যবস্থা।’ সমাজতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করতে হবে পুঁজিবাদ আর গণতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করতে হবে স্বৈরতন্ত্রকে। পুঁজিবাদের মতো সমাজতন্ত্রেরও বিভিন্ন ধরন আছে।

বর্তমানে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভেনেজুয়েলা, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়ার মতো বহু দেশে বামপন্থী/সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত দলগুলো নির্বাচন করছে, ক্ষমতায়ও যাচ্ছে। ইউরোপের বহু দেশে ডানপন্থী আক্রমণের মুখে প্রবাসী মানুষ এ রকম দলের ভরসাতেই থাকেন। কমিশন ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’র কথা বলেছে। আসলে এটি কতিপয় গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত প্রাণবিনাশী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। সেই পন্থী কিছু গোষ্ঠী ছাড়া দুনিয়ার কেউ এটাকে আর কাঙ্ক্ষিত পথ বলে মনে করে না; ইউরোপ-আমেরিকাতেও নয়। এই পথ ধরলে এটাও বলতে হবে-‘সাম্য’ ও ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ কথাগুলো আমরা রেখেছি অলংকার হিসেবে। আর এটাও বলতে হবে যে বৈষম্যহীনতার দিকে যাওয়ার পরিবর্তে বৈষম্য বৃদ্ধির দিকে যাওয়ার অর্থনীতিই অব্যাহত থাকবে। বলতে হবে এটাই ‘বৈশ্বিক এবং জাতীয় প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক’। মানতে হবে যে দেয়ালের গ্রাফিতিতে ভুল প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়েছিল!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন