৪৫ বছর বয়সী ইয়াসমিন আরা প্রতিদিন ভোরে পরিবারের সবার আগে ঘুম থেকে ওঠেন। সকালের নাশতা তৈরি, তিন সন্তানের টিফিন প্যাক করা এবং তাদের স্কুলে পাঠানোর দায়িত্ব তার। তারপর শুরু হয় ঘরের কাজড়পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কাপড় কাঁচা, রান্না-বান্না, এবং বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়ির দেখভাল। তার দিন শেষ হয় না, একটানা গৃহস্থালি ও যত্নশীলতার কাজ চলতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত অর্থনীতির জ্ঞান ম্লান হয়ে গেছে, আর তার জায়গা নিয়েছে ঘর সামলানোর অভিজ্ঞতা। তবে রাত পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করেও ইয়াসমিনের কোনো বেতন নেই, নেই কোনো পদোন্নতি বা আর্থিক নিরাপত্তা। অথচ সমাজ তাকে “বেকার গৃহিণী” বলে আখ্যা দেয়।
ইয়াসমিনের মতো লক্ষ লক্ষ নারী পারিবারিক দায়িত্বের কারণে চাকরির সুযোগ হারাচ্ছেন। সুলভ ও নির্ভরযোগ্য শিশু যত্নের ব্যবস্থা না থাকায় এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে তারা গৃহিণী হতে বাধ্য হন। ইয়াসমিনের প্রতিদিনের শ্রম যদি আর্থিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তবে তার আয় একজন পেশাদার কর্মীর থেকেও বেশি হতে পারত। একজন গৃহকর্মী মাসে ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পান।পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও কাপড় কাঁচার জন্য ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা দিতে হয়। একজন গৃহশিক্ষক ৫,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা নেন। বৃদ্ধদের সেবাযত্নে নিযুক্ত কর্মী মাসে ১২,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা পান। ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে খরচ পড়ে ৭,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা।
এগুলো যোগ করলে দেখা যায়, ইয়াসমিনের শ্রমের আর্থিক মূল্য মাসে ৩২,০০০ থেকে ৭০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অথচ তার স্বামীর চাকরির বেতনকে সমাজ মূল্যবান মনে করলেও তার কাজ অদৃশ্য থেকে যায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২০১৮ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে ১৬.৪ বিলিয়ন ঘণ্টা বিনা পারিশ্রমিকে পরিচর্যা কাজ করা হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS)-এর ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের গৃহস্থালি ও পরিচর্যা শ্রমের আর্থিক মূল্য ২০২১ সালে ৫.৩ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ১৪.৮ শতাংশ। অন্যদিকে পুরুষদের অনাদায়ী শ্রম জিডিপির মাত্র ২.৮ শতাংশ। নারীরা প্রতিদিন গড়ে ৪.৬ ঘণ্টা গৃহস্থালি কাজে এবং ১.২ ঘণ্টা পরিচর্যা শ্রমে ব্যয় করেন, যেখানে পুরুষেরা যথাক্রমে মাত্র ০.৬ ও ০.২ ঘণ্টা ব্যয় করেন।
যেসব নারী চাকরি করেন, তাদেরও পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নয়। চাকরির পাশাপাশি তাদের গৃহস্থালি দায়িত্ব বহাল থাকে। ৩২ বছর বয়সী তিলোত্তমা, যিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। পাঁচ মাসের সন্তানকে কোলে নিয়ে অফিসে যেতে বাধ্য হন, কারণ শিশু যত্নের সহজলভ্য কোনো ব্যবস্থা নেই। তার স্বামী ব্যস্ত, ফলে পুরো চাপ তাকেই সামলাতে হয়। ২৯ বছর বয়সী শিক্ষক মাইশা মুবারসারা শিশুদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র ও গৃহকর্মীর পেছনে তার উপার্জনের প্রায় অর্ধেক ব্যয় করেন, তবুও কাজের চাপ কমে না।মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, “নারীরা পরিবারের স্বাস্থ্যের যত্ন নেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং পরিবারের সার্বিক কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাদের এই শ্রমকে স্বীকৃতি দিলে পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।”
ফাহমিদা খাতুন, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক, বলেন, “‘তারা কিছু করে না’ এই দৃষ্টিভঙ্গি নারীদের অবদানকে খাটো করে। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেলে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান দৃঢ় হবে।” অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, “গৃহস্থালি শ্রমের স্বীকৃতি শুধু উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক ইস্যু। নীতি সংস্কার, বাজেট বরাদ্দ, এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।” বর্তমানে জাতীয় হিসাব ব্যবস্থা (SNA) গৃহস্থালি শ্রমকে জিডিপির আওতায় আনে না। তবে ২০২৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিকল্পনা কমিশনকে অনাদায়ী গৃহস্থালি শ্রমের আর্থিক মূল্যায়ন পদ্ধতি খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) উপপরিচালক আসমা আক্তার বলেন, “গৃহস্থালি শ্রম অর্থনৈতিক লেনদেনের আওতায় না পড়ায় এটি জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না। তাই বিকল্প পদ্ধতির প্রয়োজন।” অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ নাইলা কবির বলেন, “জিডিপি একটি সীমিত মানদণ্ড, যা বিলিয়ন ঘণ্টার অনাদায়ী শ্রমের গুরুত্ব বিবেচনায় আনে না। সমাজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এই শ্রম অপরিহার্য।” নারীর গৃহস্থালি ও পরিচর্যা শ্রম অদৃশ্য নয় বরং এটি সমাজ ও অর্থনীতির চালিকাশক্তির অংশ। এটি শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক এবং নীতিগত ইস্যু। সুলভ শিশুযত্ন, কর্মস্থলে নমনীয় নীতি এবং আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা গেলে নারীরা কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারবেন, যা অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করবে।


