গাজায় যুদ্ধবিরতি ‘এ কেমন শান্তি’ হাসান ফেরদৌস , নিউইয়র্ক

যে প্রস্তাবের ভিত্তিতে এখন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলো, অবিকল সেই চুক্তি গত বছরের মে মাসে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ঢাকঢোল পিটিয়ে উপস্থিত করেছিলেন। একই প্রস্তাব জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তিনি পাস করিয়েও নিয়েছিলেন। নেতানিয়াহু তাতে কান দেননি।

৪৬৫ দিনের একতরফা যুদ্ধ শেষে গাজা ভূখণ্ডে যুদ্ধবিরতি হতে যাচ্ছে। গাজায় নেমেছে কবরের নীরবতা। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গাজার বাসিন্দা আহমদ আল মাশরাভি বলেছেন, ‘এ কেমন শান্তি? মাথার ওপর নিরাপদ আচ্ছাদন নেই। ঘরে খাবার নেই, সুপেয় পানি নেই, আমার সন্তানেরা ক্ষুধায় কাতরাচ্ছে। চারদিকে কেবলই ধ্বংস আর ধ্বংস। আপনি একে শান্তি বলেন?’ তারপরও গাজার ফিলিস্তিনবাসী ১৫ মাসের নৃশংসতার পর অর্জিত যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে। তিন ধাপের সেই যুদ্ধবিরতির প্রথম দিন আজ রোববার। তবে কত দিন তা টেকে, সন্দেহ রয়েছে।

মার্কিন চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর মন্ত্রিসভার কট্টরপন্থীদের চাপ অগ্রাহ্য করে যুদ্ধবিরতি অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু তা শুধু প্রথম ধাপ বা প্রথম ৪২ দিনের জন্য। সামান্য যেকোনো অজুহাতে ইসরায়েল হামাসকে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে যুদ্ধবিরতি বাতিল করতে পারে। আবার শুরু হতে পারে নির্বিচার বোমাবর্ষণ। অভ্যন্তরীণ আপত্তি অগ্রাহ্য করে নেতানিয়াহু যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকরণে সক্ষম হলেন, তার জন্য বাহবা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাপ্য। পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ২০ জানুয়ারি তার শপথ গ্রহণের আগেই গাজা থেকে জিম্মিদের ফিরিয়ে আনতে হবে, অন্যথা মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলবে।

যে প্রস্তাবের ভিত্তিতে এখন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলো, অবিকল সেই চুক্তি গত বছরের মে মাসে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ঢাকঢোল পিটিয়ে উপস্থিত করেছিলেন। একই প্রস্তাব জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তিনি পাস করিয়েও নিয়েছিলেন। নেতানিয়াহু তাতে কান দেননি। এবার সেই একই প্রস্তাব তিনি মেনে নিয়েছেন দুই কারণে। প্রথমত, তাঁর কৌশলগত লক্ষ্য বহুলাংশে অর্জিত হয়েছে, হামাস ও হিজবুল্লাহ সামরিকভাবে পরাস্ত হয়েছে। অন্য কারণ, ট্রাম্পের দাবি মেনে নিয়েছেন, এমন একটি ভাব করে তিনি শুধু যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব আরও পোক্ত করলেন, তা-ই নয়, এ অঞ্চলে তাঁর অনর্জিত কৌশলগত স্বার্থ আদায়ের পথ প্রশস্ত করে রাখলেন। গাজার পর তার লক্ষ্য ইরানের সামরিক স্থাপনা ও সিরিয়ায় ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি।

কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের ধারণা, গাজা যুদ্ধের একটি সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে ফিলিস্তিনের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রশ্নে ‘টু স্টেট সলিউশন’ (দুই রাষ্ট্র সমাধান) নিয়ে আবার আলাপ-আলোচনার শুরু। কিন্তু বাস্তবতা সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দেয় না। ট্রাম্প নিজে এবং তাঁর প্রস্তাবিত মন্ত্রিসভার প্রত্যেকে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। মাইক হাকাবি, যাকে তিনি ইসরায়েলে পরবর্তী মার্কিন রাষ্ট্রদূত মনোনীত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, পুরো ফিলিস্তিনের ওপরেই ইসরায়েলের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

হামাসের সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ। অথচ নেতানিয়াহু নিজে সুপরিকল্পিতভাবে তাদের কাজ করার ক্ষমতা খর্ব করেছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ভেঙে পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি তিনি বাড়িয়েই চলেছেন। আরব দেশগুলো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারত, কিন্তু তাদের কেউই এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বরং উল্টো, মার্কিন প্রশাসনের উৎসাহ ও উদ্যোগে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে অধিক আগ্রহী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন