ক্যানাবিস চিকিৎসায় ব্যবহারের ইতিহাস বহু প্রাচীন। মিশরের প্রাচীন সভ্যতায় ক্যানাবিস ব্যথানাশক এবং স্নায়ু শান্তকারী ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হত। চীনে এটি মাংসপেশির ব্যথা ও উদ্বেগ নিরাময়ে এবং ভারতে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ক্যানাবিসের নানা চিকিৎসা গুণের উল্লেখ রয়েছে। গ্রিসের চিকিৎসক হিপোক্রেটিসও ক্যানাবিসের ব্যবহার সম্পর্কে তাঁর রচনাতে আলোচনা করেছেন। সেই সময়ের মানুষের বিশ্বাস ছিল, ক্যানাবিস শরীরের ক্ষত নিরাময়ে সহায়তা করে এবং মানসিক অবসাদ কমাতে কার্যকর। প্রাচীন বিশ্বে এটি ছিল অন্যতম জনপ্রিয় এবং মূল্যবান ঔষধ।
১৮৩৯ সালে ভারতীয় চিকিৎসক উইলিয়াম অরটেন ডেভিস ক্যানাবিসের ব্যথানাশক গুণাবলী নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর গবেষণার মাধ্যমে জানা যায়, ক্যানাবিস মানুষের শরীরে ব্যথা কমানোর পাশাপাশি উদ্বেগ এবং স্নায়ুজনিত সমস্যারও সমাধান দিতে পারে। ডেভিসের এই গবেষণা পশ্চিমা চিকিৎসকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং ক্যানাবিসের চিকিৎসাগত ব্যবহার সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। ১৮৪০-এর দশক থেকে ক্যানাবিস পশ্চিমা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নিয়মিত ব্যবহৃত হতে থাকে এবং ব্যথা, উদ্বেগ এবং মানসিক সমস্যা নিরাময়ে কার্যকর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
১৮৯০-এর দশকে ক্যানাবিস পশ্চিমা চিকিৎসাব্যবস্থায় আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ সময় চিকিৎসকরা এটি ব্যবহৃত করতেন প্রধানত ব্যথা কমানো, মাইগ্রেন এবং মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসায়। এই সময়টি ছিল ক্যানাবিসের ব্যাপক ব্যবহারের যুগ এবং এটি বিভিন্ন ধরনের মেডিকেল সমস্যায় কার্যকর মনে করা হতো। বিশেষ করে, ক্যানাবিসের গুণাবলী স্নায়ুতন্ত্রের ওপর শান্তিপূর্ণ প্রভাব ফেলে মস্তিষ্কের উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতা কমাতে সাহায্য করতো। বহু রোগী এবং চিকিৎসক ক্যানাবিসের সুবিধা গ্রহণ করতে শুরু করেন এবং এটিকে তখনকার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা উপাদান বানিয়ে তোলেন।
১৯৬১ সালে জাতিসংঘ ক্যানাবিসকে একটি শিডিউল ওঠ ড্রাগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, ফলে বিসশ্বব্যাপী ক্যানাবিসকে অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং ক্ষতিকর পদার্থ হিসেবে গণ্য হতে থাকে। এই সিদ্ধান্তটি ক্যানাবিসের চিকিৎসা ব্যবহার এবং গবেষণার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে। ক্যানাবিসের বৈধ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয় এবং গবেষণাও প্রায় থেমে যায়। এটি একসময় শুধুমাত্র একটি recreational ড্রাগ হিসেবে পরিচিত হয়ে পড়ে।
জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ক্যানাবিসের চিকিৎসাগত বৈশিষ্ট্যগুলিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার সুযোগ নষ্ট করে দেয়। ফলে, ক্যানাবিস শুধুমাত্র মাদক হিসেবে পরিচিত হতে থাকে, যার কারণে এর সম্ভাব্য চিকিৎসাগত সুবিধা অনেকাংশে উপেক্ষিত হয়ে যায়। এই সময় থেকেই ক্যানাবিসের ব্যবহার এবং গুরুত্ব সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে ক্যানাবিসের চিকিৎসাগত ব্যবহার আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। বিশ্বের অনেক দেশ এখন ক্যানাবিসের চিকিৎসা ব্যবহারের অনুমোদন দিচ্ছে এবং এটি অনেক রোগের চিকিৎসায় সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষভাবে ক্যানাবিসের থেরাপিউটিক উপাদান CBD (ক্যানাবিডিওল) এবং THC (টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল) নিয়ে নতুন গবেষণা চলছে। এই উপাদানগুলি দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, মৃগী, এবং ক্যান্সারের কিছু উপসর্গের চিকিৎসায় কার্যকর হতে পারে। এর সম্ভাবনাকে নতুন করে উদ্ভাসিত করে বর্তমানে অনেক রোগী ক্যানাবিসের চিকিৎসাগত সুবিধা পাচ্ছেন।
CBD এবং THC ক্যানাবিসের দুইটি প্রধান উপাদান। CBD উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতা কমাতে সহায়ক এবং এটি কোনো মাদক সৃষ্টিকারী প্রভাব তৈরি করে না। অন্যদিকে THC ক্যানাবিসের কার্যকরী উপাদান যা মাদক সৃষ্টিকারী প্রভাব ফেলতে পারে, তবে তবে এটি ব্যথা এবং মানসিক রোগের চিকিৎসায় সাহায্য করে। বর্তমান গবেষণায় দেখা গেছে, এই দুটি উপাদান মানব শরীরে অনেক ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, অস্থিরতা এবং মৃগীর চিকিৎসায় কার্যকর হতে পারে গবেষণার মাধ্যমে এর চিকিৎসাগত ব্যবহার আরও গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।
ক্যানাবিসের অনেক চিকিৎসাগত সুবিধা থাকলেও এর উল্লেখযোগ্য অপকারিতাও রয়েছে। অতিরিক্ত ক্যানাবিস ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এটি মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ এবং মনোযোগের অভাব সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষত তরুণদের মধ্যে মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে, সাথে শিখন ক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তি প্রভাবিত করতে পারে। এছাড়াও ক্যানাবিসের একটি সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা। কিছু মানুষ ক্যানাবিস ব্যবহারের পর অতিসক্রিয় অনুভব করে এটি মানসিক অবস্থা এবং আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে। পাশাপাশি ক্যানাবিস ব্যবহারের পর মানসিকভাবে অস্বস্তি বা বিরক্তিও অনুভব করতে পারে। ক্যানাবিসের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে চললে তা ব্যাক্তির মনে প্যারানয়েড ভাবনা বা সাইকোসিস সৃষ্টি করে বলে প্রমাণিত হয়েছে।


