“…কিছুদিন আগেও যেকোনো বক্তৃতা, রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা আর আলাপ শুরু হতো শ্রমিককৃষকের কথা দিয়ে। মানে, যে মানুষগুলো সমাজে সংখ্যায় বেশি, যারা আসলে কেবল টিকে থাকে, যারা বেঁচে থাকে না, সেই মানুষগুলোর কথা দিয়ে। সেসব মানুষ এখন অদৃশ্য আর নেই হয়ে গেছেন আমাদের রাজনীতির আলাপ থেকে। …দুনিয়াজুড়ে এই ঘটনা ঘটছে। মানুষ হারিয়ে গিয়ে রাজনীতির বিষয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন মতাদর্শ। গরিব মানুষ এখন আর রাজনীতির বিষয় নয়। তারা বড়জোর ভোটের সময় দিন কয়েকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।
তা-ও যদি সত্যি সত্যি তাঁরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পান।
নিখোঁজ হয়ে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে মুছে যাচ্ছে মানুষ। একসময় রাজনীতিতে বাস্তব মানুষের প্রতিফলন পাওয়া যেত। ক্ষমতায় যাওয়াই এখনো বহাল রাজনীতির মূল কথা। কিন্তু তা হয়ে গেছে এক বিমূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায়। বাস্তব মানুষ ধীরে ধীরে গৌণ হয়ে পড়েছে। তাদের জায়গা নিয়েছে ‘সংস্কৃতি’, ‘পরিচয়’ এবং ‘প্রতিনিধিত্ব’-এর মতো বিমূর্ত ধারণা। …১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে ধীরে ধীরে একাডেমিক বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে একটি নতুন ধারা প্রচলিত করতে শুরু করে। বাস্তব মানুষের জীবন আর সমস্যা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ‘ভাষা’, ‘সংস্কৃতি’, ও ‘প্রতিনিধিত্ব’ রাজনীতির প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠল।
এখন তো দুনিয়াজোড়াই আমজনতার প্রকৃত সংকট-আর্থিক বৈষম্য, কাজ উপার্জনের নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া-এসব ইস্যু রাজনীতির মূলধারায় গুরুত্ব হারিয়েছে। মানুষের কথা বলবে এমন কোনো প্রক্রিয়া এখন আর শক্তিশালী নয়।এখন রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সাংস্কৃতিক প্রশ্নের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কোনোমতে টিকে থাকা মানুষগুলো সব সময় খাপ খাইয়ে নেয়। ভোটের সময় কিছুদিনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কাছে আসে, প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু নির্বাচনের পর তারা আবার বিস্মৃত হয়। পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি মূলধারার আলোচনায় উঠে আসে। মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলো যখন অন্য কোনো রাজনীতির আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়, তখন কার লাভ হয়? …টিকে থেকে আর কত দিন? আমরা বাঁচতে চাই।


