ক্ষমতা কীভাবে স্বাধীনতাকে সংজ্ঞায়িত করে? ফুকো, হবস ও অ্যারিস্টটলের দার্শনিক বিচার

ক্ষমতা এবং স্বাধীনতা মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই দর্শন, রাজনীতি এবং সমাজের মূল আলোচ্য বিষয়। এই দুটি ধারণা একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত— কখনও সাংঘর্ষিক, কখনও পরিপূরক। মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে বাস করি, আর এই কাঠামোর নিরিখেই নির্ধারিত হয় আমাদের স্বাধীনতার পরিসর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিকারের স্বাধীনতা বলতে কী বোঝায়? এবং ক্ষমতা কীভাবে সেই স্বাধীনতাকে সংজ্ঞায়িত বা সীমিত করে?

সাধারণভাবে ক্ষমতাকে স্বাধীনতার বিপরীত মনে করা হয়। যদি কেউ ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তবে অন্যজনের স্বাধীনতা খর্ব হয়। একটি সরকার যখন জনগণের উপর আইন প্রয়োগ করে, তখন জনগণের ইচ্ছামতো কাজ করার স্বাধীনতা সীমিত হয়। কিন্তু এই সরলীকরণ ক্ষমতা ও স্বাধীনতার গভীর সম্পর্কটিকে এড়িয়ে যায়।

প্রাচীনকাল থেকেই দার্শনিকেরা ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে ভেবেছেন। অ্যারিস্টটল ক্ষমতাকে রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখেছিলেন।তাঁর মতে, মানুষ স্বভাবতই রাজনৈতিক প্রাণী এবং একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্র বা সমাজে বসবাস করেই সে তার পূর্ণ মানবীয় সম্ভাবনা অর্জন করতে পারে। এখানে রাষ্ট্রের আইন ও ক্ষমতা নাগরিকদের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ন্ত্রণ করে, যা আপাতদৃষ্টিতে স্বাধীনতা খর্ব মনে হলেও, অ্যারিস্টটলের কাছে এটি বৃহত্তর স্বাধীনতার ভিত্তি। রাষ্ট্রের ক্ষমতা নাগরিকদের বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি দেয়, যার ফলে তারা ভালো জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ পায়। তাই এখানে ক্ষমতা স্বাধীনতার রক্ষক ও ধারক।

অন্যদিকে, আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি স্থাপনকারী দার্শনিক টমাস হবস ক্ষমতার অন্য এক দিক তুলে ধরেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ লেভিয়াথান-এ তিনি দেখান প্রাকৃতিক অবস্থায় মানুষের স্বাধীনতা ছিল নিরঙ্কুশ—প্রত্যেকেই সবকিছুর উপর অধিকার রাখত। কিন্তু এই সব পাওয়ার স্বাধীনতা আসলে ছিল এক সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ অবস্থা, যেখানে জীবন ছিল “একাকী, জঘন্য, ঘৃণ্য, পাশবিক এবং ক্ষণস্থায়ী।” এই বিশৃঙ্খল স্বাধীনতা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ স্বেচ্ছায় তাদের সমস্ত স্বাধীনতা এক সার্বভৌম শক্তির হাতে তুলে দেয়, যাকে হবস ‘লেভিয়াথান’ বা সার্বভৌম রাষ্ট্র নামে অভিহিত করেন। হবসের মতে, এই ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা হয় বলেই মানুষ বেঁচে থাকার এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষার মৌলিক স্বাধীনতা পায়। এখানে বিনিময়ে ব্যক্তি তার অনেক অধিকার হারালেও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।

বিশ শতকের প্রভাবশালী দার্শনিক মিশেল ফুকো ক্ষমতা সম্পর্কে প্রচলিত সমস্ত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি ক্ষমতাকে রাষ্ট্রের বা শাসকের হাতে থাকা কোনো বস্তু বা সম্পত্তি হিসেবে দেখেননি, যা উপর থেকে প্রয়োগ করা হয়। বরং ফুকোর কাছে ক্ষমতা হলো এক সম্পর্ক জাল যা সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি মুহূর্তে কাজ করে।

ক্ষমতা আমাদের জ্ঞান, পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা এবং সত্যকে তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ বিদ্যালয়, হাসপাতাল, কারাগার বা এমনকি বিজ্ঞানের মতো প্রতিষ্ঠানগুলি নির্দিষ্ট জ্ঞান তৈরি করে এবং এর মাধ্যমে আমাদের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফুকো একে ‘ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার’ বা শৃঙ্খলা স্থাপনকারী ক্ষমতা বলেন।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে, স্বাধীনতা আর ক্ষমতার বাইরের কোনো অবস্থা নয়। মানুষ সর্বদাই কোনো না কোনো ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে থাকে। যখন আমরা নিজেকে স্বাধীন মনে করি, তখন আমরা হয়তো কেবল সেই ক্ষমতা জালের অধীনে কাজ করছি, যা আমাদের এই স্বাধীনতার অনুভূতি তৈরি করতে সাহায্য করেছে। ফুকোর কাছে, সত্যিকারের স্বাধীনতা হলো সেই ক্ষমতা জালকে চিহ্নিত করা এবং তার সাথে লড়াই করা, যা তিনি ‘প্রতিরোধ’ বলে আখ্যায়িত করেন। যেহেতু ক্ষমতা সর্বত্র, প্রতিরোধও সর্বত্র। স্বাধীনতা হলো এই চলমান প্রতিরোধের প্রক্রিয়া।

ফুকো, অ্যারিস্টটল ও হবসের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, স্বাধীনতার ধারণাটি একক বা স্থির নয়। অ্যারিস্টটল এর মতে, স্বাধীনতা হলো সমাজে থেকে নৈতিক ও সৎ জীবন যাপন করার ক্ষমতা। ক্ষমতা এখানে শৃঙ্খলা ও মঙ্গলের পরিবেশ তৈরি করে। হবস এর মতে, স্বাধীনতা হলো নিরাপত্তা ও জীবনধারণের অধিকার। ক্ষমতা বিশৃঙ্খল প্রাকৃতিক স্বাধীনতা থেকে মুক্তি দেয়। ফুকো’র মতে, স্বাধীনতা হলো সর্বব্যাপী ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিরোধ। এটি ক্ষমতা-সম্পর্কের বাইরে কোনো অবস্থা নয়, বরং সেই সম্পর্কের ভেতরেই একটি ক্রিয়াশীল প্রক্রিয়া।

তাহলে মানুষ কতটা স্বাধীন?

বাস্তবে মানুষের স্বাধীনতা আপেক্ষিক ও শর্তসাপেক্ষ। কেউ যদি মনে করে, সে সমাজের কোনো নিয়ম মানবে না বা কোনো ক্ষমতার অধীন থাকবে না, তবে তাকে হয় সমাজের বাইরে চলে যেতে হবে, অথবা চরম মূল্য দিতে হবে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, পছন্দ বা আকাঙ্ক্ষা সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং ক্ষমতার অলক্ষ্য জালের দ্বারা প্রভাবিত।

সত্যিকারের স্বাধীনতা সম্ভবত কোনো নিরঙ্কুশ অবস্থা নয়, একটি সচেতন প্রক্রিয়া। এটি হলো যেসব ক্ষমতা কাঠামো আমাদের জীবনকে সংজ্ঞায়িত করছে, সেগুলোকে বুঝতে পারা। নিজেকে সেই কাঠামোগুলির দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করা। অ্যারিস্টটলের মতো করে বৃহত্তর সামাজিক মঙ্গলের দিকে লক্ষ্য রাখা।

আমরা তখনই সবচেয়ে বেশি স্বাধীন, যখন আমরা বুঝতে পারি আমরা পুরোপুরি স্বাধীন নই। এই জ্ঞানই আমাদের নিজেদের উপর, সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর ক্রিয়াশীল ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার এবং প্রতিরোধের শক্তি যোগায়। ক্ষমতা ও স্বাধীনতার মধ্যে সম্পর্ক তাই কোনো স্থির সমীকরণ নয়, বরং মানব অস্তিত্বের এক গতিশীল দ্বন্দ্ব, যা আমাদের প্রতিনিয়ত এক উন্নত ও মানবিক সমাজের দিকে চালিত করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন