কেমন ছিলো মিশরের স্বর্ণযুগের স্থপতি দ্বিতীয় রামেসিসের রাজত্বকাল?

প্রাচীন মিশরের ইতিহাসে দ্বিতীয় রামেসিস (আনুমানিক ১৩০৩-১২১৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এক অনন্য শাসক ছিলেন। তাঁর প্রায় ৬৬ বছরের সুদীর্ঘ শাসনকালকে মিশরের ক্ষমতা ও গৌরবের চূড়ান্ত শিখর হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি শুধু একজন যোদ্ধা হিসেবেই নন, একজন দক্ষ কূটনীতিক এবং দূরদর্শী নেতা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে নির্মিত বিশাল সব স্থাপত্যকীর্তি, জনসংযোগ এবং কূটনৈতিক সাফল্যের মধ্য দিয়ে তিনি মিশরের এক নতুন অধ্যায় রচনা করেন।

তিনি এতটাই সফল ছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর নয়জন ফারাও তাঁর নাম ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন, যা মিশরের ইতিহাসে তাঁর মহান অবস্থানকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।

দ্বিতীয় রামেসিসের সামরিক শক্তি ও কৌশল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। তাঁর পিতামহ, প্রথম রামেসিস, একজন সাধারণ যোদ্ধা থেকে নিজেদের রাজবংশে উন্নীত করেছিলেন। তাঁর বাবা, প্রথম সেতি, উত্তর সীমান্তে শক্তিশালী হিট্টাইট সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মিশরের সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছিলেন। এই শক্তিশালী সামরিক পটভূমি সত্ত্বেও, দ্বিতীয় রামেসিসকে সিংহাসনে আরোহণের পরপরই হিট্টাইটদের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। ১৪ বছর বয়সে যখন তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন হিট্টাইটরা মিশরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য শহর কাদেশ দখল করে নেয়।

দ্বিতীয় রামেসিস কাদেশ পুনরুদ্ধারের জন্য একটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু তিনি হিট্টাইটদের গুপ্তচরদের ফাঁদে পড়েন, যারা তাকে বিভ্রান্ত করে। গুপ্তচরদের ভুল তথ্যের কারণে তিনি মনে করেছিলেন হিট্টাইটরা শিবির থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে, অথচ তারা কাছেই ওঁৎ পেতে ছিল। এই আকস্মিক আক্রমণে মিশরীয় বাহিনী প্রায় পরাজিত হতে বসেছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত সৈন্যদল এসে পৌঁছালে তারা রক্ষা পায়। রামেসিস ওই যুদ্ধ জিতলেও কৌশলগতভাবে তিনি যুদ্ধে জয়ী হননি। বিপর্যস্ত মিশরীয় সেনারা কাদেশ থেকে পিছু হটেছিল।

তবে রামেসিস এই পরাজয়কে পরাজয় হিসেবে দেখাতে চাননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি রাষ্ট্রের মর্যাদা শুধু সামরিক বিজয়ে নয়, বরং জনসমক্ষে তার ভাবমূর্তির ওপরও নির্ভর করে। তাই তিনি সারা মিশরের বিভিন্ন মন্দিরের দেয়ালে এমন দেয়ালচিত্র তৈরির নির্দেশ দেন, যেখানে দেখানো হয়েছে তিনি একাই শত্রুপক্ষকে পরাজিত করছেন। এই কল্পিত বিজয়গাথা সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর ক্ষমতা ও বীরত্ব সম্পর্কে এক ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে। এটি ছিল প্রাচীনকালে জনসংযোগের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত, যেখানে সত্যের চেয়ে অনুভূত বিজয়ের গুরুত্ব ছিল বেশি।

কাদেরশের যুদ্ধের পর দীর্ঘদিন ধরে মিশর ও হিট্টাইটদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। কিন্তু দ্বিতীয় রামেসিস বুঝতে পেরেছিলেন সামরিক সংঘাতের চেয়ে কূটনৈতিক সমাধান অধিক ফলপ্রসূ। বহু বছরের আলোচনার পর তিনি হিট্টাইট রাজা হাত্তুসিলির সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন।

এটি ছিল মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম লিখিত শান্তিচুক্তি, যার মূল পাঠ এখনো টিকে আছে। এই চুক্তির একটি অনুলিপি হিয়েরোগ্লিফিক লিপিতে কার্নাকের মন্দিরের একটি ফলকে খোদাই করা হয়েছিল। আরেকটি অনুলিপি আক্কাদিয়ান ভাষায় লেখা একটি মাটির ফলকে ১৯০৬ সালে আধুনিক তুরস্কের বোঘাজকোয়-এর কাছে আবিষ্কৃত হয়।

এই চুক্তির প্রধান শর্তগুলো ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল। উভয় পক্ষই নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের ফিরিয়ে দিতে এবং তাদের কোনো ক্ষতি না করতে সম্মত হয়। পাশাপাশি বিদেশি বা অভ্যন্তরীণ কোনো শত্রুর আক্রমণের মুখে উভয় পক্ষ একে অপরকে সাহায্য করার ব্যাপারেও অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। এই চুক্তির গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, এর একটি অনুলিপি আজও নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে প্রদর্শিত হচ্ছে।

এই চুক্তির মাধ্যমে দ্বিতীয় রামেসিস শুধু নিজের সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেননি, কূটনৈতিক প্রজ্ঞার এক অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। চুক্তির প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের নিদর্শন হিসেবে তিনি হিট্টাইট রাজার জ্যেষ্ঠ কন্যাকে বিবাহ করেন। এই বিবাহ ছিল রাজনৈতিক মৈত্রীর এক অন্যতম উদাহরণ, যা দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি স্থাপন করে।

দ্বিতীয় রামেসিসের শাসনকালের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তাঁর বিশাল স্থাপত্য নির্মাণ প্রকল্প। কোনো ফারাও এত বেশি সংখ্যক স্থাপনা তৈরি করেননি। কার্নাক এবং আবু সিম্বেলের বিশাল মন্দিরগুলো তাঁর স্থাপত্য-প্রেম ও ক্ষমতার প্রতীক। আবু সিম্বেলের মন্দির, যা তিনি নিজের এবং প্রধান স্ত্রী নেফারতারির জন্য তৈরি করেছিলেন, তা আজও মিশরের স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

তাঁর অন্ত্যেষ্টি মন্দির, রামেসিয়াম, ‘রাজাদের উপত্যকা’য় অবস্থিত ছিল, যেখানে প্রায় ১০,০০০ প্যাপিরাস স্ক্রোল সম্বলিত একটি বিশাল গ্রন্থাগার ছিল। এটি তাঁর জ্ঞান ও শিক্ষার প্রতি আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। তিনি তাঁর বাবার সম্মানার্থে আবিডসে মন্দির নির্মাণের কাজও সম্পন্ন করেন।

রামেসিস নিজের সুনাম ও উত্তরাধিকার স্থায়ী করার জন্য নিরলস চেষ্টা করেছেন। তিনি তাঁর নতুন রাজধানী পের রামেসু-এর নামকরণ নিজের নামে করেন। তিনি একশোরও বেশি সন্তানের জনক ছিলেন, যা তাঁর অঢেল সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর এই সমস্ত প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল, কারণ তাঁর মৃত্যুর পর নয়জন ফারাও তাঁর নাম গ্রহণ করেছিলেন। এই ঘটনাটি তাঁর স্থায়ী প্রভাব এবং মর্যাদা প্রমাণ করে।

দ্বিতীয় রামেসিসের জীবন ও শাসনকাল ছিল সামরিক দুর্বলতা, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং জনসংযোগের এক মিশ্রণ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে একটি সাম্রাজ্যকে মহান করা যায় না। বরং স্থাপত্য, শিল্পকলা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একটি জাতির প্রকৃত মহত্ব প্রকাশ পায়। কাদেশের যুদ্ধে তাঁর কৌশলগত পরাজয় সত্ত্বেও, তিনি তার প্রচারণার মাধ্যমে নিজেকে একজন বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি প্রমাণ করে তিনি সামরিক সংঘাতের চেয়ে কূটনীতিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাঁর এই দূরদৃষ্টির ফলস্বরূপ মিশর এক দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে হেঁটেছিল, যা দ্বিতীয় রামেসিসকে “মহান” এবং “শাসকদের শাসক” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন