বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষাকে বিবেচনা করা হলেও বাস্তবে এই স্তরটি নানা সংকটে জর্জরিত। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং একমুখী ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। শিশুদের মধ্যে ন্যূনতম জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতা গঠনের সূচনা হয় এই পর্যায় থেকেই। তাই এর গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় বহুমাত্রিকতা, বৈষম্য এবং দুর্বল বিনিয়োগের কারণে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিটিই দুর্বল থেকে যাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশ একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এখানে প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তত ১১ ধরনের প্রতিষ্ঠান এবং ৫ ধরনের কারিকুলাম চালু আছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিশুদের ভিন্ন ভিন্ন সিলেবাসে শিক্ষা দিচ্ছে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ থাকলেও এখনও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
ঢাকার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে ঢাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ছিল মাত্র ১৯.৬ শতাংশ।আগের বছরের তুলনায় তা প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে। মূলত সরকারি বিদ্যালয়গুলোয় মানসম্পন্ন শিক্ষা, উপযুক্ত অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও যুগোপযোগী কারিকুলামের অভাব অভিভাবকদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে সমাজে একটি শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে যেখানে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রধান সমস্যা হলো অবকাঠামোর দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত খেলার মাঠ, অপরিচ্ছন্ন শ্রেণিকক্ষ, নিরাপত্তাহীন পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব। এছাড়া শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও পেশাগত মর্যাদা খুবই নিম্নমানের, যা শিক্ষকদের পেশাগত অনুপ্রেরণা হ্রাস করে। নেপ-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৩১.৩ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষক এসএসসি বা এইচএসসি পাশ, অর্থাৎ তারা নিজেরাই বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাসে ঘাটতিপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন শিক্ষা পাওয়া স্বাভাবিকভাবেই অসম্ভব।
অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো কারিকুলাম সাজিয়ে অভিভাবকদের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা দিচ্ছে।তারা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, ইংরেজিমাধ্যম, সহায়ক পাঠদান পদ্ধতি ও ক্লাসের বাইরে বাড়তি যত্ন প্রদানের মাধ্যমে সচেতন ও সামর্থ্যবান অভিভাবকদের আকৃষ্ট করছে। অন্যদিকে সরকারি বিদ্যালয়গুলো উপেক্ষিত হয়ে পড়ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের মানগত ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিক সমাজে বৈষম্যকে তীব্রতর করছে।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাজেট ঘাটতি। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া উচিত হলেও বাংলাদেশ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দিয়েছে মাত্র ১.৬৯ শতাংশ, যা বিগত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত কমছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষা খাতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও অনেক পিছিয়ে। এই বিনিয়োগ ঘাটতির ফলে মানসম্পন্ন অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, সহায়ক উপকরণ সরবরাহ সবকিছুতেই ঘাটতি দেখা যায়।
তবে এই সংকটের একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে সরকার অতীতে কয়েকবার বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছে। ১৯৭৩ সালে ৩৭ হাজার এবং ২০১৩ সালে ২৬ হাজার বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। এতে অনেক শিক্ষক সরকারি চাকরির সুযোগ পান। কিন্তু শিক্ষা মানোন্নয়নে তা যথেষ্ট ছিল না। জাতীয়করণের ফলে বেতন কিছুটা বাড়লেও পেশাগত মর্যাদা এবং পরিবেশগত সুবিধা বৃদ্ধি পায়নি।
এই সংকট উত্তরণে কয়েকটি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি:
১. একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা – সব শিক্ষার্থী যেন একই সিলেবাসে, একই মানের শিক্ষা পায়, তা নিশ্চিত করা।
২. সরকারি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন – খেলার মাঠ, নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, টয়লেট সুবিধা ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও বেতন বৃদ্ধি – দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে।
৪. বিনিয়োগ বাড়ানো – শিক্ষায় জিডিপির কমপক্ষে ৪-৬% ব্যয় বরাদ্দ করতে হবে, যাতে মৌলিক অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্ভব হয়।
৫. অপরিকল্পিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ – বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিয়মনীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা শুধু একটি স্তর নয়, এটি একটি জাতির ভিত্তি। যদি এই ভিত্তি দুর্বল থাকে, তাহলে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাও দাঁড়াবে না। তাই এখনই সময় প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন করে ভাবার, বিনিয়োগ বাড়ানোর এবং নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়নের।


