১৯৮৯ সালের শেষ দিকে যখন বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়ল, বিশ্ব যেন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সাম্রাজ্যভিত্তিক যুগের অবসান ঘটছে, এমনটাই মনে হলো পশ্চিমা নেতাদের। এক বছর না যেতেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ঘোষণা দিলেন নতুন এক বিশ্বব্যবস্থা’ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু তিরিশ বছর পেরিয়ে এসে আজ ২০২৫ সালে আবারও এক প্রশ্ন উঠছে, এই বিশ্বব্যবস্থা কি আর আগের মতো আছে?
আমরা যখন বিশ্বব্যবস্থা বলি, আসলে কী বুঝি? একটা দেশ যেভাবে শাসিত হয়, নিয়ম-আইন থাকে, কেউ সেই আইনের প্রয়োগ করে, পৃথিবীর ক্ষেত্রে এমন কেউ নেই। পৃথিবী এক বিশাল অরাজকতা, যেখানে একেকটা রাষ্ট্র নিজের মতো চলতে চায়। তবুও একটা অদৃশ্য কাঠামো আছে যেটা আমরা বলি বিশ্বব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার ভিত্তি হলো শক্তির ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক নিয়ম আর ন্যায্যতার স্বীকৃতি।
তবে এই “ন্যায্যতা” এক জায়গায় স্থির থাকে না। ইতিহাস বলে বৈধতা অনেক সময় শুধু বিজয়ীর ভাষায় লেখা হয়। ১৭৪০ সালের ইউরোপে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যাবে প্রুশিয়ার রাজা ফ্রেডরিক দ্য গ্রেট চাইলে অস্ট্রিয়ার সিলেশিয়া প্রদেশ জবরদখল করে নিচ্ছেন, তাতে কোনো আন্তর্জাতিক আপত্তি নেই। কিন্তু আজ যদি কোনো রাষ্ট্র তেমনটা করে, সেটাকে বলা হয় আগ্রাসন।
এই বদলের পেছনে বড় একটা মোড় এসেছে ১৯৪৫ সালের পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ থেকে জাতিসংঘের জন্ম। তারা বলল যুদ্ধ যদি হয়, তা হবে শুধু আত্মরক্ষার জন্য, নতুবা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি নিয়ে।
তবে বাস্তবতা কী?
২০০৮ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন আর্থিক সংকটে পড়ে, অনেকেই ধরে নেয় তারা হয়তো দুর্বল হচ্ছে। রাশিয়া তখনই আক্রমণ চালায় জর্জিয়ায়। চীন ততদিনে ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করছে। ২০১৪ সালে পুতিন ইউক্রেন দখল করলেন। যুক্তি দিলেন আত্মরক্ষা। কিন্তু জাতিসংঘে বেশিরভাগ দেশ বলল এটা আগ্রাসন। তবে রাশিয়ার পাশে দাঁড়াল চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো।
ভাবছেন জাতিসংঘ কি কিছু করতে পারল?
না। কারণ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স আর ব্রিটেন, সবাই ভেটো ক্ষমতা রাখে। কেউ চাইলেই যে কোনো প্রস্তাব আটকে দিতে পারে। এই ভেটো অনেক সময় একটা সিস্টেমের সার্কিট ব্রেকারের মতো কাজ করে যাতে পুরো ব্যবস্থাটাই ধ্বংস না হয়। সমস্যা হলো এই ব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্রমাগত কমছে।
পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে দেখবে ১৯১৭ সালে মার্কিন অর্থনীতি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল। তারপর বিশ্বযুদ্ধ শেষে তারা বিশ্বনেতা হতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তা হতে দিল না। ফলে ১৯৩০-এর দশকে নাৎসি ও জাপানিজ সাম্রাজ্যবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ফের শক্তিশালী হলো, তবে এবার সোভিয়েত ইউনিয়ন এক বিকল্প শক্তি হয়ে দাঁড়াল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভেঙে পড়ল এবং আমেরিকা পেল “unipolar moment”, একক আধিপত্যের সময়।
কিন্তু সেই মুহূর্তটা তারা ধরে রাখতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক ভুল এবং ভেতরের বিভাজন তাদের ক্ষমতা খর্ব করল। এই ফাঁকেই চীন মাথা তুলে দাঁড়াল। আর এখন ২০২৫ সালে বিশ্বের মানুষ জিজ্ঞাসা করছে, আমরা কি নতুন এক ব্যবস্থা দেখতে যাচ্ছি?
চীন আর রাশিয়ার সম্মিলিত অর্থনীতি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপ ও জাপানের সঙ্গে জোট বজায় রাখে, তাহলে তাদের সম্মিলিত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি এখনো বিশ্বব্যবস্থার চালিকাশক্তি।
তবে প্রশ্নটা এখানে থেমে থাকে না। প্রশ্নটা হলো যুক্তরাষ্ট্র কি নিজের অভ্যন্তরীণ সংকট, বিভাজন আর স্বার্থপর নেতৃত্ব সামলে নিয়ে সেই নেতৃত্ব বজায় রাখতে পারবে? এই মুহূর্তে ইতিহাসের মোড় ঘুরছে এটা বোঝা যায়। তবে এই মোড় নিয়ন্ত্রণে রাখবে কে? পুতিন? শি জিনপিং? নাকি মার্কিন জনগণের সিদ্ধান্ত?
আমরা যদি ভবিষ্যতে ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখি ২০২৫ সাল সেখানে লেখা আছে কোনো বড় বাঁক হিসেবে, তাহলে সেটা হয়তো হবে কারো আগ্রাসন নয়, বরং কোনো রাষ্ট্রের আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের ফলাফল। বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠে বিজয় আর ভুলের গল্পে। আজ আমরা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কী হবে আগামীকাল, তা নির্ধারণ করবে আজকের সিদ্ধান্ত।


