বাংলাদেশের বিদ্যমান জেল কোডের বহু পুরনো মজুরি বিধান অনুসারে কারাগারে থাকা বন্দিরা কাজ করলে দৈনিক মাত্র ২ টাকা মজুরি পান। এই অপ্রতুল পারিশ্রমিক বন্দিদের শ্রমের মাধ্যমে পুনর্বাসনের উৎসাহকে নষ্ট করে।
গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘Right to Employment in Prison: Employment as a Basic Human Need’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিষয়টি তুলে ধরেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ মোতাহার হোসেন।
তিনি বলেন, জেল কোড অনুযায়ী একজন বন্দিকে প্রতিদিন যে কাজই করুক না কেন—ফার্নিচার তৈরি, সেলাই কিংবা পোশাক উৎপাদন—মাত্র ২ টাকা দেওয়া হয়।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, কারাগারে তৈরি পণ্য কম দামে বিক্রি হয় শুধু উৎপাদন দক্ষতার কারণে নয়, বরং অপ্রতুল মজুরি কাঠামোর জন্য।
কারা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে ৭০,০০০-এর বেশি বন্দি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫% প্রবীণ এবং ৬৫,০০০ বন্দির বয়স ১৮ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে।
তবে বন্দিদের কেবলমাত্র একটি ছোট অংশই উৎপাদনমূলক কাজে নিয়োজিত, যার প্রধান কারণ হলো পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায়, কারা বিভাগ কারাগারের ভেতর ‘ওপেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে বেসরকারি কোম্পানিগুলো উৎপাদন ইউনিট স্থাপন করতে পারবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
প্রথম পর্যায়ে ১০,০০০ বন্দিকে কর্মসংস্থানের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মোতাহার বলেন, “আমরা যদি প্রতিদিন মাত্র ১০০ টাকা মজুরি দিতে পারি, সেটাই হবে একটি ‘গেম চেঞ্জার’।”
“একজন বন্দি মাসে ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা আয় করে ঘরে টাকা পাঠাতে পারবে। এতে পরিবার উপকৃত হবে, এবং বন্দিরাও আশার আলো দেখবে,” তিনি যোগ করেন।
এই জোনগুলো বন্দিদের জন্য উন্নত জীবনযাপন, চলাচলের স্বাধীনতা, ভালো খাবার ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির সুযোগ দেবে, তবে নিরাপত্তা বিধি বজায় রেখে। উদ্দেশ্য হলো এমন একটি বাস্তব কর্মপরিবেশ তৈরি করা, যা মর্যাদা ও জীবনের লক্ষ্য ফিরিয়ে আনবে।
মোতাহার আরও জানান, কারাগারকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধনাগারে রূপান্তরের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় প্রণয়নাধীন Correction Services Act-2025 এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।
তিনি বলেন, নতুন আইনটি পুরনো জেল কোডের পরিবর্তে একটি আধুনিক কাঠামো তৈরি করবে, যা বন্দিদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের অধিকার নিশ্চিত করবে।
এই পরিকল্পনায় আগ্রহ দেখিয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি উদ্যোক্তা ও আন্তর্জাতিক অংশীদার। যদিও কিছু মানবাধিকার সংগঠন জোরপূর্বক শ্রমের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, মতাহার আশ্বস্ত করে বলেন, এতে অংশগ্রহণ হবে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক এবং মজুরি হবে ন্যায্য।
তিনি বলেন, “অনেক বন্দি আছেন যারা ২০-২৫ বছর সাজা খেটে বের হন, কিন্তু পরিবার তাদের গ্রহণ করে না। তারা ফিরে যান শূন্য হাতে।”
সরকার বর্তমানে কেবল বন্দিদের খাবারের পেছনেই বছরে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় করে, যেখানে মোট বাজেট প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। বছরে প্রায় ৮ লাখ বন্দি কারাগারে আসা-যাওয়া করেন।
এই বিশাল সংখ্যার সামান্য অংশকেও যদি উৎপাদনশীল শ্রমে যুক্ত করা যায়, তাহলে সরকারি ব্যয় কমবে এবং পুনর্বাসনের পথও উন্মুক্ত হবে।
মোতাহার বলেন, “কর্মসংস্থানকে অধিকার হিসেবে দেখতে হবে, সুবিধা হিসেবে নয়। যদি আমরা চাই যে কারাগার থেকে সংশোধিত হয়ে উন্নত মানুষ বের হয়ে আসুক, তাহলে আমাদের তাদের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করতেই হবে।”


