কামুর The Plague – অনিশ্চয়তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে মানুষ কীভাবে বাঁচে?

মৃত্যু কি কেবল একটি জৈবিক সমাপ্তি? নাকি তা এক মহাকাব্য, যা আমাদের শিখিয়ে যায় মানুষের প্রকৃত পরিচয়? আলবেয়ার কামুর ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত উপন্যাস “দ্য প্লেগ” কেবল ১৯৪০-এর দশকে ইউরোপে ঘটে যাওয়া এক মহামারীর নিছক আখ্যান নয়। এটি মূলত মানব অস্তিত্বের এক শাশ্বত প্রশ্নচিহ্ন—অকস্মাৎ নেমে আসা অমঙ্গলের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ কীভাবে তার নৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করবে? কামু এই উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে ফরাসি উপনিবেশ আলজেরিয়ার উপকূলীয় শহর ওরাঁ-কে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি প্লেগকে শুধুমাত্র একটি রোগ হিসেবে চিত্রিত করেননি, বরং এটিকে তিনি মানবজীবনে অনিবার্য অমঙ্গল, অযৌক্তিকতা এবং নৈরাশ্য-এর এক শক্তিশালী রূপক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

উপন্যাসটির শুরুতেই দেখা যায় একটি সাধারণ একঘেয়ে শহরে ইঁদুরের মৃত্যু দিয়ে শুরু হয় এই মহাবিপর্যয়। প্রথমে কেউই এর গুরুত্ব বোঝে না, কিন্তু যখন মানুষের মৃত্যু শুরু হয় তখন শহরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই বিচ্ছিন্নতা ও নির্বাসনই জন্ম দেয় গভীর মানবিক ভীতি।

ওরাঁর নাগরিকরা হঠাৎ করেই তাদের পরিচিত আরামদায়ক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদের কাছে এই প্লেগ ছিল এক অনাহুত অতিথি, যা ঈশ্বরের অভিশাপ বা প্রকৃতির খেয়াল কোনো কিছুরই যুক্তি মানে না। এটিই হলো কামুর মতে মানব অস্তিত্বের অযৌক্তিকতা বা Absurdity-র প্রকাশ। মৃত্যু যখন এতই নৈর্ব্যক্তিক ও দৈব, তখন মানুষ অসহায় বোধ করে।

এই ভীতির কয়েকটি স্তর উপন্যাসে দেখা যায়। প্রথম দিকে মানুষ বিশ্বাসই করতে চায়নি প্লেগ এত গুরুতর হতে পারে। তারা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছিল। সাথে আছে শহর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার ও প্রিয়জন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার তীব্র বেদনা। ডক্টর বার্নার্ড রিয়ো-র নিজের স্ত্রীকে শহরের বাইরে রেখে আসা এবং সাংবাদিক রামবার্ট-এর প্রেমিকার কাছে ফিরে যাওয়ার মরিয়া চেষ্টা এই যন্ত্রণার প্রতীক।

মৃত্যুর হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভয় তাদের গ্রাস করে। এই পরিস্থিতিতে কামুর চরিত্ররা নিজেদেরকে পৃথিবীর একাকী বাসিন্দা হিসেবে অনুভব করে, যেখানে মৃত্যু যে কোনো মুহূর্তে থাবা বসাতে পারে।

এই ভীতিই মানুষকে আত্মসমালোচনার মুখে দাঁড় করায়। তারা জানতে চায় এই অমঙ্গলের কারণ কী? কেন এমন ঘটলো? ধর্মযাজক প্যানেলু প্রথমে একে মানুষের পাপের জন্য ঈশ্বরের শাস্তি বললেও, প্লেগের ভয়াবহতা ও এক নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু দেখে তাঁর মত পাল্টে যায়। তিনি বোঝেন অমঙ্গল কেবল পাপীদের জন্য আসে না, তা নির্বিচারে আঘাত হানে।

ভীতির চরম পর্যায়ে কামু এক নতুন পথের সন্ধান দেন, আর তা হলো সমষ্টিগত প্রতিরোধ ও মানবিক সংহতি। কামুর মতে, যদি মানুষের জীবনে অমঙ্গল ও অযৌক্তিকতা অনিবার্য হয় তবে তার মোকাবিলা করার একমাত্র পথ হলো এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, যা তিনি অভিহিত করেছেন বিদ্রোহ হিসেবে। প্লেগের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহই হলো নৈতিকতা।

এই প্রতিরোধের নৈতিক ভিত্তি তিনটি প্রধান চরিত্রের মাধ্যমে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। রিয়ো হলেন উপন্যাসের প্রধান মানবতাবাদী চরিত্র। তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা প্লেগের কারণ নিয়ে তর্কে না গিয়ে কেবল মানুষের যন্ত্রণা কমানো ও বাঁচার জন্য লড়াই-এ বিশ্বাসী। তাঁর কাছে প্লেগ হলো এমন এক রোগ যা বারবার ফিরে আসতে পারে। তাই তার বিরুদ্ধে কাজ করে যাওয়াটাই সততা। রিয়ো কোনো বীর নন, তিনি একজন সাধারণ মানুষ যিনি কোনো পুরস্কারের আশা না করে তার পেশাগত ও মানবিক দায়িত্ব পালন করে যান। তাঁর নিঃস্বার্থ শ্রম প্লেগের বিরুদ্ধে মানবিক সংহতির মূল স্তম্ভ।

জ্যাঁ তারু হলেন সেই চরিত্র যিনি প্লেগকে মানব সমাজের এক স্থায়ী নৈতিক অসুস্থতা হিসেবে দেখেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি মানুষের ভেতরেই “প্লেগ” সুপ্ত থাকে এবং এই অমঙ্গলের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করে যেতে হবে। তিনি প্লেগের মোকাবিলায় স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করেন। তারুর কাছে ভালোবাসা ও সংহতিই হলো এই রোগের বিরুদ্ধে একমাত্র প্রতিরোধ।

পৌরসভার কর্মচারী জোসেফ গ্রাঁ আপাতদৃষ্টিতে অকিঞ্চিত্কর। তিনি একটি নিখুঁত বাক্য লেখার চেষ্টা করেন, কিন্তু কখনও শেষ করতে পারেন না। গ্রাঁ-এর মতো সাধারণ মানুষের নীরব, দৈনিক পরিশ্রম, যারা কেবল কোনো বড় স্বীকৃতির প্রত্যাশা না করে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে গেছেন, তা-ই হলো এই প্রতিরোধের আসল ভিত্তি। কামু দেখিয়েছেন, বড় বড় বুলি বা দার্শনিক বিতর্কের চেয়ে এই দৈনিক, নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্লেগ উপন্যাসের শেষে রোগ বিদায় নিলেও কামু সতর্ক করে দেন, প্লেগের বীজ কখনও পুরোপুরি মরে না, তা সুপ্ত থাকে এবং যেকোনো সময় ফিরে আসতে পারে।

“দ্য প্লেগ” আধুনিক মানুষকে শেখায় অমঙ্গল যখন সম্মিলিতভাবে আসে, তখন তাকে সমষ্টিগত সংহতির মাধ্যমেই মোকাবিলা করতে হয়। এটি এমন এক নৈতিকতার কথা বলে, যা কোনো ধর্মীয় বা দার্শনিক বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, প্রতিষ্ঠিত মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ও অকৃত্রিম ভালোবাসার ওপর। এই উপন্যাসের মাধ্যমে কামু মানবিক ভীতিকে জয় করে প্রতিরোধের এক শক্তিশালী নৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা আজও পৃথিবীর যেকোনো মানবিক সঙ্কটে মানুষের বাঁচার এবং লড়াই করার অনুপ্রেরণা যোগায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন