কলা বিশ্বের অন্যতম প্রধান খাদ্য ফসল হিসেবে মানুষের খাদ্যাভাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি বিশ্বের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ফসল হিসেবে বিবেচিত। তবে বর্তমানে কলার উৎপাদন ও টেকসইতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর পেছনে রয়েছে নানা কারণ—প্রধানত রোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, কর্পোরেট লবিং এবং স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার নেতিবাচক প্রভাব।
কলার সবচেয়ে বড় শত্রু হল ছত্রাকজনিত পানামা উইল্ট রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হলে গাছের পাতা হলুদ হয়ে শুকিয়ে যায়, গাছের গোড়া পচে যায় এবং শেষ পর্যন্ত গাছ মারা যায়। এই রোগের সংক্রমণ এতটাই মারাত্মক যে, আক্রান্ত জমিতে ক্যাভেনডিশ জাতের কলা চাষ আর সম্ভব হয় না। বিশ্বে কলার সরবরাহের প্রায় ৮০ শতাংশ এই জাতের কলা থেকে আসে, তাই এই রোগের বিস্তার বিশ্বব্যাপী কলার উৎপাদনে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
কলা গাছে অন্যান্য রোগ যেমন সিগাটোকা লিফ স্পট, অ্যানথ্রাকনোজ এবং ইয়েলো লিফ রোগও ব্যাপক ক্ষতি করে। এছাড়া থ্রিপস, কাটওয়ার্ম ও এফিডের মতো কীটপতঙ্গ কলার গুণগত মান ও উৎপাদন কমিয়ে দেয়। এসব রোগ ও কীটপতঙ্গের নিয়ন্ত্রণে সঠিক কীটনাশক প্রয়োগ, আক্রান্ত অংশ অপসারণ এবং মাঠ পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্বে হাজারের বেশি কলার জাত থাকলেও বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় ক্যাভেনডিশ জাতের কলা। এই জাতের কলা গাছের জিনগত বৈচিত্র্য নেই, ফলে এটি নতুন রোগ বা পরিবেশগত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না।
বন্য বা বুনো কলা জাতগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। আফ্রিকার মাদাগাস্কারে এমন কয়েকটি বুনো কলার গাছ বেঁচে আছে, যেগুলো ভবিষ্যতে কলার টেকসই উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা এই বুনো কলাগুলোকে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করে রোগ প্রতিরোধী ও সুস্বাদু নতুন জাত তৈরির চেষ্টা করছেন।
তাছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কলার চাষের উপযোগী পরিবেশ সংকুচিত হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি বন্যা, খরা ও অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া কলার উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নীতি প্রণয়নে প্রভাব বিস্তার করে, যা কখনো কখনো ছোট কৃষকদের ক্ষতি করে এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করে। স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার অধীনে কৃষকদের অধিকার সীমিত হওয়ায় সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়।
কলার এই সংকট মোকাবিলায় জিন রূপান্তর প্রযুক্তি একটি সম্ভাবনাময় উপায়। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষকরা ক্যাভেনডিশ কলায় পানামা রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য সংযোজনের কাজ করছেন, যা কলার উৎপাদন রক্ষা করতে সাহায্য করবে।
সঠিক কীট ও রোগ ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত মনিটরিং, আক্রান্ত গাছ অপসারণ এবং পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির ব্যবহার কৃষকদের জন্য অপরিহার্য। পাশাপাশি বন্য কলার জাত সংরক্ষণ ও ব্যবহার কলার টেকসই উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


