ধরা যাক এক দুপুরে আপনি ক্যাফেতে বসে আছেন। সামনের টেবিলে দুজন চুপচাপ ল্যাপটপে চোখ গুঁজে বসে আছেন ভাবছেন নিশ্চয়ই ফ্রিল্যান্সার। কিন্তু হঠাৎ শুনলেন, একজন বলছে, “এই প্রোটিনটা যদি এভাবে ফোল্ড করে, তাহলে তো ক্যানসারের মিউটেশনটা স্পষ্ট হয়!” অন্যজন জবাব দেয়, “আমাদের মডেলটা কি AlphaFold-এর রেজাল্টের কাছাকাছি আসছে?”
আপনি একটু কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। কী এটা? প্রোটিন? ফোল্ডিং? AlphaFold? গুগল ঘেঁটে বুঝতে পারলেন, ওরা আসলে কম্পিউটেশনাল বায়োলজিস্ট। জীববিজ্ঞানের এমন এক জগতে কাজ করছে, যেখানে কোষের রহস্য বোঝা হয় কোড দিয়ে, ল্যাব নয়, ল্যাপটপ দিয়ে।
কম্পিউটেশনাল বায়োলজি নামটি শুনলে মনে হয় এটি বুঝি কেবল জটিল গবেষণার বিষয়, কেবল বিদেশি বিজ্ঞানীদের কাজ। কিন্তু এই শাখা এমন এক বিজ্ঞান, যেটি জীবনের গভীরতম প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজে অ্যালগরিদম দিয়ে।
ধরুন আপনি জানতে চান কেন আপনার পরিবারের সবাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, অথচ আপনি সুস্থ। চিকিৎসক আপনার ডিএনএ টেস্ট করে একটি অদ্ভুত জিন মিউটেশন খুঁজে পেলেন, যা আপনাকে সেই রোগ থেকে রক্ষা করেছে। এই বিশ্লেষণের পেছনে ছিল একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা শত শত রোগীর জিন বিশ্লেষণ করে এমন মিল খুঁজে বের করেছে। এই কাজটাই করে কম্পিউটেশনাল বায়োলজি।
আমরা প্রায়ই বলি “ডিএনএ আমাদের জীবনের মানচিত্র।” কিন্তু মানচিত্র দেখতে জানলে তবেই না পথ খুঁজে পাওয়া যায়! সেই মানচিত্র দেখার চশমা হলো কম্পিউটার, গণিত, এবং তথ্য বিশ্লেষণ। এই শাখার যাত্রা মোটেও আজকের নয়। ১৯৯০ সালে যখন “হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট” শুরু হয়, তখন কোটি কোটি জিনের মধ্যে কোনটি কী করে, তা জানার জন্য বিজ্ঞানীরা একাই দাঁড়িয়েছিলেন এক সমুদ্রের পাড়ে। হাতে ছিল শুধু ডিএনএ সিকোয়েন্স। সেইসময় কম্পিউটার এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছি। তখন থেকেই জীববিজ্ঞানের ভাষা বদলে যেতে শুরু করে।
কয়েক বছর আগে Google-এর DeepMind AlphaFold নামে একটি অদ্ভুত সিস্টেম তৈরি করলো। এটিকে বলা হয় জীববিজ্ঞানের ChatGPT।
এই প্রোগ্রামটি শুধু দেখে প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড সিকোয়েন্স, এবং বলে দেয় এই প্রোটিন কীভাবে ভাঁজ হবে। ব্যাপারটা এমন, যেন আপনি কারো নাম শুনেই বলে দিচ্ছেন সে দেখতে কেমন হবে!
প্রোটিনের গঠন বোঝা মানে হলো আপনি জানেন শরীরের কোন অংশে কোন প্রোটিন কাজ করে, কীভাবে রোগ হয় এবং কোন ওষুধ দিয়ে তাকে থামানো যায়। AlphaFold-এর এই ভবিষ্যদ্বাণী এখন চিকিৎসা গবেষণাকে কয়েক দশক এগিয়ে দিয়েছে।
ধরুন গ্রামের বাবা স্ট্রোকে মারা গেলেন। চিকিৎসকেরা কিছু করতে পারেননি, কারণ সময়মতো রোগ ধরা যায়নি। এখন যদি এমন একটি মেশিন তৈরি হয়, যা সেই বাবার মেয়ের জিন স্ক্যান করে বলে দিতে পারে “তোমারও স্ট্রোকের ঝুঁকি আছে, এখনই ওষুধ খাও বা লাইফস্টাইল বদলাও।” এটিই Personalized Medicine কম্পিউটেশনাল বায়োলজির বড় অবদান। ক্যানসার, আলঝেইমার, এমনকি ডিপ্রেশন এই সবকিছুই এখন আর শুধুমাত্র ডাক্তারি চেম্বারের বিষয় নয়। এখন তারা কম্পিউটার ল্যাবে গবেষণার বিষয়।
হয়তো ভাবছেন, “বাংলাদেশে এসব কি হচ্ছে?” ছোট হলেও অগ্রগতি আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োইনফরমেটিক্স বিভাগ গড়ে উঠেছে, icddr,b-তে মলিকুলার ডেটা নিয়ে কাজ চলছে। COVID-19-এর সময় বাংলাদেশি গবেষকেরা জিনোম সিকোয়েন্স করে ভাইরাসের ধরন শনাক্ত করেছেন। তবে সত্যি বলতে এখনো অনেক পথ বাকি। ডেটা নেই, প্রশিক্ষণ নেই, অনেক ক্ষেত্রে আগ্রহও নেই। কিন্তু পৃথিবী থেমে নেই।
আসুন ভাবি আপনার ফোনে যেভাবে গুগল ম্যাপ আপনাকে গন্তব্য বলে দেয়, একদিন ঠিক তেমনভাবে একটি অ্যাপ আপনাকে বলবে, “হৃদপিণ্ডে একটি সমস্যা হচ্ছে। এটা অ্যানালাইসিস করেছি তোমার লাইভ ডিএনএ এবং পুষ্টি ডেটা থেকে। এখনি চিকিৎসা নাও।” এই ভবিষ্যৎ আজ স্বপ্ন হলেও, কম্পিউটেশনাল বায়োলজি সেই স্বপ্নকে ধাপে ধাপে সত্যি করে তুলছে।
আজ যখন আমরা কোষের ভেতরের প্রতিটি জৈব প্রক্রিয়া বুঝতে চাই, তখন সেখানে জিনের সিকোয়েন্স, প্রোটিনের গঠন, কোষের আচরণ সবকিছুকে ধরা হয় সংখ্যায়, কাঠামোয়, আর কোডে। কম্পিউটেশনাল বায়োলজি আমাদের সেই যাত্রাপথের দিশারি। ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞান শুধু ডাক্তার নয়, ডেভেলপারও তৈরি করবেন।


